“নেতারা তো ফোনই ধরছেন না”-জেলায় জেলায় চরম অনিশ্চয়তায় তৃনমূলের কর্মীরা

সাড়ম্বরে দলবদল, ইস্তফা, গ্রেফতারি আর রাজনৈতিক শিবিরের সমীকরণ পরিবর্তনের খবর শিরোনামে থাকলেও, পর্দার আড়ালে এক অন্য ছবি উঠে আসছে তৃণমূল কংগ্রেসের সংগঠন নিয়ে। বড় নেতাদের দলবদল বা ‘নিরাপদ আশ্রয়ের’ খোঁজে ব্যস্ততার মাঝখানে রীতিমতো অথৈ জলে তৃণমূলের একদম নীচুতলার কর্মী এবং বুথ স্তরের নেতারা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, নিচুতলার কর্মীদের মধ্যে এখন চরম অনিশ্চয়তা ও দিশেহারা ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নেতারা কেন অধরা?

বিভিন্ন জেলা ঘুরে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। কোচবিহার থেকে নদীয়া—সবত্রই কর্মীদের অভিযোগ, বিপদের সময়ে শীর্ষস্থানীয় বা ব্লক স্তরের নেতারা ফোন ধরছেন না। বহু নেতা পরিবার-পরিজন নিয়ে এলাকাছাড়া বা গা-ঢাকা দিয়ে আছেন। কোচবিহারের প্রাক্তন যুবনেতা রাহুল রায়ের কথায়, “নেতারা এখন নিজের শেল্টারের খোঁজে ব্যস্ত, তাই কর্মীদের শেল্টার দেওয়ার মতো কেউ নেই।”

জেলাভিত্তিক সংগঠনের বেহাল দশা:

  • নদীয়া: এই জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট বলে দাবি প্রবীণ নেতাদের। অভিযোগ, জেলার সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর নাম করে এক সময় ক্যামাক স্ট্রিটের নির্দেশে বিতর্কিত ব্যক্তিদের হাতে টাকা তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যা কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। বহু পরিচিত নেতা বর্তমানে বেপাত্তা।

  • উত্তর ২৪ পরগনা: এখানে পরিস্থিতির মোড় ভিন্ন। প্রাক্তন সভাপতি নির্মল ঘোষের দাবি, দলের ভাঙন রুখতে তারা কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। তাঁর কথায়, “সবাই মমতাপন্থী, তৃণমূল মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।”

  • পূর্ব বর্ধমান: প্রাক্তন জেলা সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মতে, দলবদল বা রাজনৈতিক বিচ্যুতির প্রবণতা মূলত উচ্চপদাধিকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ব্লক স্তরের নেতারা চাপে থাকলেও, নিচুতলার কর্মীরা এখনো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরই ভরসা রাখছেন। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে নিচুতলার কর্মীদের সংযোগ এখনো তৈরি হয়নি বলেই দাবি তাঁর।

  • দক্ষিণ ২৪ পরগনা: এখানে কমিটি ভাঙা নিয়ে তৈরি হয়েছে ঘোর অনিশ্চয়তা। কর্মীদের বড় অংশ নিজেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে ‘অ্যাডজাস্ট’ করে চলার চেষ্টা করছেন। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে নিচুতলার কর্মীরা বুঝতে পারছেন না, কার নির্দেশে সংগঠন চালাবেন।

সংকট ও অনিশ্চয়তার দোলাচল: তৃণমূল কংগ্রেসের নিচুতলার কর্মীদের বড় একটা অংশ মনে করছেন, তাঁদের ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। একদিকে প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে সাংগঠনিক দুর্বলতা তৈরির অভিযোগ, অন্যদিকে শীর্ষ নেতাদের গা-ঝাড়া দিয়ে সরে যাওয়া—সব মিলিয়ে তৃণমূলের বুথ পর্যায়ের কর্মীদের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম। যদিও কর্মীদের একাংশ এখনো দলের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ভরসা রাখছেন, কিন্তু নেতাদের ফোন না ধরা এবং সংগঠনের সামগ্রিক নিষ্ক্রিয়তা সেই আস্থায় চিড় ধরিয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের ওপর মহলে এত ভাঙন এবং অস্পষ্টতা থাকলে নিচুতলার কর্মীরা যে দিশেহারা হয়ে পড়বেন, সেটাই স্বাভাবিক। সংগঠন টিকিয়ে রাখতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদৌ নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেন কি না, এখন সেটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।