বিল মেটাতে অস্বীকার, বাঁচাতে মিথ্যে ‘গরুর মাংস’ বিতর্ক! পূর্ণিয়ায় হোটেলের ওপর বর্বরোচিত হামলার পর্দাফাঁস

বিহারের পূর্ণিয়া জেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের পর্দাফাঁস করল প্রশাসন। কে. নগর থানা এলাকার গোকুলপুরের ‘খুশবু লেলহা’ হোটেলে ঘটে যাওয়া একটি বর্বরোচিত ঘটনার ভিডিও সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে দেখা যায়, কয়েকজন দুষ্কৃতকারী হোটেলের মালিক মোহাম্মদ তাজামুল, তাঁর ছেলে এবং অপর এক কর্মীকে বাঁশের লাঠি, চেয়ার দিয়ে নৃশংসভাবে মারধর করছে। শুধু তাই নয়, ভুক্তভোগীদের কান ধরে ওঠবস করতেও বাধ্য করা হয়। ভিডিওটির সঙ্গে দাবি করা হয়েছিল, ওই হোটেলে গরুর মাংস বিক্রি করা হচ্ছিল, আর সেই কারণেই ক্ষুব্ধ জনতা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে পুলিশের তদন্তে উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর সত্য—পুরো বিষয়টিই ছিল বিল পরিশোধ না করার থেকে বাঁচার এক পরিকল্পিত মিথ্যে নাটক।

হোটেলের মালিক মোহাম্মদ তাজামুল জানান, গত ১৪ জুন দুপুর নাগাদ পাঁচজন ব্যক্তি তাঁর হোটেলে আসেন। তাঁরা পরম তৃপ্তি সহকারে খাসির মাংস ও ভাত খেয়েছিলেন। কিন্তু খাওয়ার শেষে বিল দেওয়ার সময় আসতেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিল পরিশোধের বদলে তারা নিজেদের মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করে এবং হোটেলটির বিরুদ্ধে গরুর মাংস বিক্রির ভিত্তিহীন ও মিথ্যে অভিযোগ তোলে। তাজামুলের দাবি, তারা বিল না দেওয়ার জন্য এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। এই ঘটনার ফলে হোটেল মালিক ও তাঁর পরিবার আতঙ্কে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।

ভাইরাল হওয়া এই ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে ছড়িয়ে পড়ে। একটি সাধারণ মারপিট ও বিল সংক্রান্ত বিবাদকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার জন্য কুচক্রীরা ‘গরুর মাংস’ ও ‘মহিষের মাংস’ বিক্রির মিথ্যে জিগির তোলে। উদ্দেশ্য ছিল এলাকায় দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি করা এবং অহেতুক উত্তেজনা ছড়ানো। কিন্তু এই পরিকল্পিত চক্রান্তের জাল ছিন্ন করতে আসরে নামে পূর্ণিয়া পুলিশ।

পুলিশ সুপার সুইটি শেহরাওয়াত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশের একটি বিশেষ দল হোটেলে তল্লাশি চালিয়ে কোনো প্রকার গরু বা নিষিদ্ধ মাংসের অস্তিত্ব পায়নি। এসপি জানিয়েছেন, পুলিশের তদন্তে সব দাবিই বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

এই ঘটনার জেরে পূর্ণিয়া পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ফেসবুক আইডি অপারেটরসহ অভিযুক্ত তিন ব্যক্তি এবং বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে তাজামুলের দায়ের করা মামলার ভিত্তিতে পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করেছে। বর্তমানে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের একাধিক টিম তল্লাশি চালাচ্ছে।

পুলিশ প্রশাসন সাধারণ জনগণকে সতর্ক করেছে যে, যাচাই না করে কোনো ভিডিও বা পোস্টে বিশ্বাস করা উচিত নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করলে কাউকেই রেহাই দেওয়া হবে না। পূর্ণিয়ার এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, দায়িত্বজ্ঞানহীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার কীভাবে ব্যক্তিগত বিবাদকে বড় আকারের দাঙ্গার দিকে ঠেলে দিতে পারে।