‘ইউরোপের অস্ত্রেই ভারতের রক্ত ঝরেছে!’ রুশ তেল ইস্যুতে ইউরোপকে সপাটে জবাব এস জয়শঙ্করের

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের স্বাধীন বিদেশনীতি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে ফের একবার গর্জে উঠলেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ফিনল্যান্ডের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খামখেয়ালি নীতির কড়া জবাব দিলেন তিনি। ভারত কেন রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনছে, এই প্রশ্ন তুলে যে নৈতিক চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছিল, তার পাল্টা জবাবে বিদেশমন্ত্রী ইউরোপীয় অস্ত্র রপ্তানি এবং মার্কিন কৌশলের অসঙ্গতিকে কাঠগড়ায় তুলেছেন।

দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের দেশগুলো ভারতের রুশ তেল আমদানির সমালোচনা করে আসছে। এই সমালোচনাকে নস্যাৎ করে জয়শঙ্কর স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ইউরোপীয় দেশগুলো বছরের পর বছর ধরে এমন অস্ত্র বিক্রি করেছে, যা ভারতের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে। আজ তারা আমাদের রুশ তেল কেনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে? আমি কি একইভাবে ইউরোপকে বলতে পারি যে তারা ভারতের নিরাপত্তার কথা ভেবেছে?” বিদেশমন্ত্রীর এই বক্তব্যে ইউরোপের ঐতিহাসিক এবং নৈতিক দ্বিচারিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি স্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতীয় অস্ত্র ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য কখনোই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি, কিন্তু ইউরোপের অস্ত্র ভারতের জন্য দীর্ঘকাল ধরে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, রুশ তেল ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করে জয়শঙ্কর বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে কোনো ধারাবাহিকতা নেই, পুরোটাই নির্ভর করছে তাদের নিজস্ব সুবিধা-অসুবিধার ওপর। তিনি বলেন, “যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজন হয়, তখন তারা রুশ তেল কিনতে নিষেধ করে। আবার পরিস্থিতি পাল্টালে তারাই তেল কেনার অনুমতি দিয়ে দেয়। তেল কেনাবেচার সঙ্গে নৈতিকতা বা মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো জড়ানো উচিত নয়।” ট্রাম্প প্রশাসনের এই খামখেয়ালিপনাকে তিনি ‘রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি’ বলে অভিহিত করেছেন।

উল্লেখ্য, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যখন পশ্চিমের দেশগুলো রুশ তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন ভারত নিজের দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে সাশ্রয়ী মূল্যে রুশ তেল আমদানি শুরু করে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল—জাতীয় স্বার্থ যেখানে অগ্রাধিকার পায়, ভারত সেখান থেকেই তেল কিনবে। এই অবস্থানের জন্য বারবার মার্কিন চাপ থাকলেও নয়াদিল্লি তাতে মাথা নোয়ায়নি।

জয়শঙ্কর এদিন সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের নাম না করে তাঁদের দ্বিচারিতা উন্মোচন করেছেন। গত বছর আগস্ট মাসে রুশ তেল কেনার ‘অপরাধে’ ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে যখন তেলের বাজার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন ভারতকেই রুশ তেল কেনার ‘অনুমতি’ দিতে বাধ্য হয় আমেরিকা। বিদেশমন্ত্রীর এই স্পষ্ট অবস্থান বিশ্বমঞ্চে ভারতের দৃঢ় কণ্ঠস্বরকে আরও একবার প্রতিষ্ঠা করল। তিনি বুঝিয়ে দিলেন, ভারত কোনো শক্তির চাপে বা অন্যের নৈতিক সবকে চলবে না, বরং নিজেদের দেশের প্রয়োজন এবং বৃহত্তর নিরাপত্তার ভিত্তিতেই বিদেশনীতি নির্ধারিত হবে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy