প্যারিসে মোদীর জয়জয়কার! বিশ্বমঞ্চে কেন ফ্রান্সের কাছে ভারত সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু?

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ১৩ থেকে ১৮ জুনের ফ্রান্স সফর বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণকে আরও একবার নতুন করে লিখেছে। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এটি তাঁর সপ্তম ফরাসি সফর, যা ভারত ও ফ্রান্সের মধ্যেকার গভীর কৌশলগত বন্ধুত্বেরই প্রমাণ। বর্তমানে প্যারিস ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক প্রথাগত কূটনৈতিক গণ্ডি পেরিয়ে এক অনন্য আস্থার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে, যা বিশ্বমঞ্চে ভারতের গুরুত্বকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
মোদীর এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা। তবে এর বাইরেও রয়েছে একাধিক চমক—যেমন নিস শহরে ‘ইন্ডিয়া ইনোভেটস’ অনুষ্ঠান এবং ইউরোপের বৃহত্তম প্রযুক্তি সম্মেলন ‘ভিভাটেক’-এ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। এবারের জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে ভারতকে শুধু অতিথি হিসেবে নয়, বরং ফ্রান্সের বিশেষ আমন্ত্রণে সব ট্র্যাকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
ভারত-ফ্রান্স বন্ধুত্বের মূল ভিত্তি নিহিত রয়েছে সেই কঠিন সময়ে, যখন ১৯৯৮ সালের পোখরান পারমাণবিক পরীক্ষার পর পশ্চিমা বিশ্ব ভারতের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ফ্রান্সই ছিল হাতে গোনা সেই দেশগুলোর মধ্যে একটি, যারা ভারতের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং ভারতের কৌশলগত উদ্বেগগুলোকে সম্মান জানিয়েছিল। সেই থেকেই দুই দেশের আস্থার সম্পর্ক মজবুত হয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফ্রান্স জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ লাভের দাবির সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সমর্থক।
প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘রাফাল’ যুদ্ধবিমান হয়ে উঠেছে আস্থার চূড়ান্ত প্রতীক। বর্তমানে এটি শুধু যুদ্ধবিমান ক্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দুই দেশ এখন স্করপেন সাবমেরিন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং হেলিকপ্টার ইঞ্জিনের মতো ক্ষেত্রে যৌথ উৎপাদনের পথে হাঁটছে। ভারত ও ফ্রান্সের ‘ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোডম্যাপ ২০২৪’ দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এছাড়া ইসরো এবং সিএনইএস-এর মহাকাশ গবেষণা ও পারমাণবিক শক্তি নিয়েও দুই দেশ এখন নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
বাণিজ্যিক দিক থেকেও ফ্রান্স এখন ইউরোপে ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য অংশীদার। ইউপিআই (UPI) গ্রহণকারী ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স আইফেল টাওয়ারের মতো বিশ্ববিখ্যাত জায়গায় ভারতের ডিজিটাল প্রযুক্তির জয়জয়কার নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য ১৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর এই সফরে ডিজিটাল উদ্ভাবন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্টার্টআপ এবং ক্লিন এনার্জির মতো আধুনিক ক্ষেত্রগুলোতে নতুন অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ২০২৬ সালকে ‘ভারত-ফ্রান্স উদ্ভাবন বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে দুই দেশ বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের সম্পর্ক কেবল প্রতিরক্ষা নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সমৃদ্ধির জন্য এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।