বাংলার রাজনীতির অন্দরে এখন কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে এক অভূতপূর্ব ভাঙনের শব্দ। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত সিদ্ধান্তকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দুটি শক্তিশালী বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতির সঙ্গে মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ভাঙনের অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছেন। রাজ্য বিধানসভা থেকে লোকসভা—উভয় কক্ষেই এখন ‘আসল তৃণমূল’ হওয়ার লড়াই তুঙ্গে।
বিধানসভায় ইতিমধ্যেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে বিরোধী দলনেতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে স্পিকারের দপ্তর। এবার সেই একই চিত্রনাট্য মঞ্চস্থ হতে চলেছে জাতীয় স্তরে। লোকসভায় দলের মুখ্য সচেতক কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ জনেরও বেশি সাংসদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে নিজেদের আলাদা ব্লক এবং স্বীকৃতির দাবি জানাতে চলেছেন। বিদ্রোহী শিবিরের এক শীর্ষ নেতার কথায়, “দলের সিংহভাগ জনপ্রতিনিধি যখন আমাদের সঙ্গে, তখন আইনি ও গণতান্ত্রিক—উভয় দিক থেকেই আমরাই আসল তৃণমূল।” স্পিকারের অনুমতি মিললেই তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিএ জোটের দিকে ঝুঁকে পড়বেন।
বিদ্রোহীদের এই রণকৌশলের নেপথ্যে রয়েছে সুচিন্তিত এক ব্লু-প্রিন্ট। সূত্র মারফত জানা যাচ্ছে, তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো স্পিকারের মাধ্যমে বৈধতা অর্জন করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল দলটিকে খাতায়-কলমে ‘নকল’ প্রমাণ করা। লোকসভা থেকে স্বীকৃতি আদায় করে নেওয়ার পর তাঁদের পরবর্তী গন্তব্য হতে চলেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। সেখানে গিয়ে দলের নাম এবং ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীকের উপর সম্পূর্ণ অধিকার দাবি করবেন তাঁরা।
পরিসংখ্যান বলছে, এই লড়াইয়ে বিদ্রোহীদের হাতে রয়েছে তুরুপের তাস। রাজ্যের ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৬০ জনেরও বেশি রয়েছেন ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে। অন্যদিকে, লোকসভার ২৮ জন সাংসদের মধ্যে ২০ জনের বেশি বিধায়ক কাকলি ঘোষ দস্তিদারের ব্লকে। এই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেই প্রধান হাতিয়ার করে তাঁরা নির্বাচন কমিশনে আবেদন জানাবেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, সোমবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের দিল্লির বাসভবনে আয়োজিত রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এই গোটা রোডম্যাপটি চূড়ান্ত হয়েছে। সেখানে মহারাষ্ট্রের একনাথ শিন্ডের মডেল অনুসরণ করার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে গেছে।
বিজেপির এক শীর্ষ সূত্র জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের ডিওয়াই চন্দ্রচূড় বেঞ্চের রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। সেই রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, যে শিবিরের কাছে সাংসদ ও বিধায়কের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকবে, আইনি প্রক্রিয়ায় প্রতীক পাওয়ার অধিকারী তারাই। তবে কালীঘাট বা ক্যামাক স্ট্রিটের নেতৃত্বও যে বিনা যুদ্ধে জমি ছাড়বে না, তা নিশ্চিত। এই আইনি লড়াই নির্বাচন কমিশন থেকে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সব মিলিয়ে, দলের প্রতীক ও সংগঠনের মালিকানা নির্ধারণের এই লড়াইয়ে চূড়ান্ত ফয়সালা পেতে আগামী চার থেকে পাঁচ মাস বাংলার রাজনীতিতে এক চরম অস্থিরতা অব্যাহত থাকবে।





