আগামী বছর পাঁচটি রাজ্যে অনুষ্ঠিত হতে চলা বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক ময়দানে এক বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে কংগ্রেস। শাসকদল বিজেপিকে টেক্কা দিতে কংগ্রেস এবার এক সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত সামাজিক প্রকৌশলের ওপর জোর দিচ্ছে। দলের দুটি প্রধান স্তম্ভ—দলিত এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়—কে এক মঞ্চে এনে এক নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে হাত শিবির। কংগ্রেসের তফসিলি জাতি (এসসি) ও সংখ্যালঘু বিভাগের এই যৌথ উদ্যোগ আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় দলিত ও সংখ্যালঘু—এই দুই সম্প্রদায়ই সবচেয়ে বেশি প্রান্তিক। দলিতরা যেখানে জাতপাতের বৈষম্যের শিকার, সেখানে সংখ্যালঘুরা ধর্মের নামে নিয়মিত নিশানা হচ্ছেন। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে উভয় সম্প্রদায়কেই বঞ্চিত রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ কংগ্রেসের। এই বঞ্চনার বিরুদ্ধে শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং একটি আদর্শিক সংযোগ তৈরির লক্ষ্যে আগামী ৬ই জুন দিল্লিতে এক বিশাল যৌথ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে শুধু দলীয় নেতারা নন, সমাজের সচেতন নাগরিক, সমাজকর্মী, বুদ্ধিজীবী এবং শিল্পীরাও অংশ নেবেন। আলোচনার মাধ্যমে উভয় সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নতির একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা হবে।
দিল্লির এই সম্মেলনের পর কংগ্রেসের লক্ষ্য হলো উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরাখণ্ড, গোয়া এবং মণিপুরের মতো নির্বাচনী রাজ্যগুলিতে এই কর্মসূচি ছড়িয়ে দেওয়া। কংগ্রেসের এই নতুন কৌশলের পেছনে রয়েছে এক গভীর অঙ্ক। নির্বাচনী রাজ্যগুলিতে দলিত ও সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের সম্মিলিত শক্তি প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ। রাজনৈতিক কৌশলবিদদের মতে, এই ভোটব্যাংককে একজোট করতে পারলে কংগ্রেসের ক্ষমতায় ফেরার পথ অনেক বেশি প্রশস্ত হবে। পর্যায়ক্রমে তারা অনগ্রসর শ্রেণি এবং দরিদ্র উচ্চবর্ণের মানুষের সমর্থনও নিজেদের দিকে টানতে চাইছে।
বিশেষ করে উত্তর প্রদেশে বিএসপি-র প্রভাব কমায় সেখানে দলিত ভোটাররা একটি শক্তিশালী বিকল্পের সন্ধানে রয়েছেন। কংগ্রেস সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে তৎপর। অন্যদিকে, লোকসভা নির্বাচনে রাহুল গান্ধীর ‘সংবিধান বাঁচাও’ অভিযানের সাফল্য দলিত মহলে দলের জনপ্রিয়তা অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাহুল গান্ধী সংখ্যালঘু নেতাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন—অন্যায় হলে পর্দার আড়ালে না লুকিয়ে সরাসরি আওয়াজ তুলতে হবে।
কংগ্রেসের মতে, বিজেপি ও আরএসএস-এর হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের রাজনীতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিকে হয়ে আসবে। মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের মতো মৌলিক অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে সাধারণ মানুষ যখন তিতিবিরক্ত, তখন ঘৃণার রাজনীতির চেয়ে উন্নয়ন ও অধিকারের রাজনীতিই মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করবে। আঞ্চলিক দলগুলোর সীমাবদ্ধতাকে সামনে রেখে কংগ্রেস নিজেকে বিজেপির একমাত্র জাতীয় বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। দিল্লিতে শুরু হতে চলা এই সামাজিক পরীক্ষা নিরন্তর নির্বাচনী লড়াইয়ে কতটা কার্যকরী হয়, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।





