আকাশ ও সমুদ্রের জোড়া বিপদ! সারের সংকটে কি আকাশছোঁয়া হতে চলেছে বাঙালির রান্নার খরচ?

ভারতের কৃষি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে মাথার ওপর কম বৃষ্টির পূর্বাভাস, অন্যদিকে দুই হাজার কিলোমিটার দূরের হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের জেরে সার সরবরাহের সঙ্কট—সব মিলিয়ে কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে ভারত কাঁচামাল ও তৈরি সারের জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নৌপথকে বিপর্যস্ত করে তোলায় ভারতের আমদানি ব্যয় হু হু করে বাড়ছে।

সম্প্রতি আবহাওয়া দপ্তর (IMD) জানিয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে ২০২৬ সালে ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী গড়ের মাত্র ৯০ শতাংশ বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বর্ষার ইঙ্গিত। একদিকে ফসলের বপন মরশুম শুরু, অন্যদিকে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া ও ডিএপি-র দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় ভারত সংঘাতের আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যে ২৫ লক্ষ টন ইউরিয়া কিনতে বাধ্য হয়েছে।

এই আর্থিক চাপ সামলাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয় এবং কৃষকদের রাসায়নিক সারের ব্যবহার অর্ধেকে নামিয়ে আনার ডাক দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞ মানস মজুমদারের মতে, ভারত এখন একটি “দুষ্টচক্রের” মধ্যে রয়েছে। সারের ভর্তুকির বোঝা এবং আমদানির আকাশছোঁয়া খরচ ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে সার-সম্পর্কিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আমদানি খরচ বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে রান্নার বাজেটে। সার ভর্তুকি বিল ৩ লক্ষ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা সরকারের বাজেটে ১.৭ লক্ষ কোটি টাকার অনুমানের চেয়ে অনেকটাই বেশি। এর ফলে চলতি হিসাবের ঘাটতি জিডিপির ১.৫২ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। রুপির দাম ইতিমধ্যেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৮৫-৯৫-এর ঘরে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি না বদলালে ডলারের বিপরীতে রুপি ১০০-এর কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে মুদ্রাস্ফীতিকে তীব্র করবে।

বর্তমানে অবশ্য ভারতের কাছে বাফার স্টক থাকায় এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে আইসিআরএ-র অদিতি নায়ারের মতো অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, খরিফ মরশুম মিটে গেলেও রবি মরশুমের জন্য সারের প্রাপ্যতা বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হলে এবং এল নিনোর প্রভাবে বৃষ্টি কম হলে, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ করা সরকারের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এখন দেখার, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার দ্বিমুখী আক্রমণ ভারত কীভাবে সামলায়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy