দশ বছর আগের সেই বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা আজও ভুলতে পারেননি নদিয়ার কৃষ্ণগঞ্জের চাকরিপ্রার্থীরা। ২০১৬ সালে সরকারি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে যে চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছিল তাঁদের, তার ক্ষত আজও টাটকা। তৎকালীন প্রভাবশালী ‘গুন্ডাবাহিনী’র দাপটে সেদিন বিডিও অফিস থেকে ঘাড় ধাক্কা খেয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছিল যোগ্য প্রার্থীদের। এক দশক ধরে প্রশাসনের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও মেলেনি সুরাহা। তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই দীর্ঘদিনের অন্ধকার কাটিয়ে ফের আশার আলো দেখছেন তাঁরা।
ঘটনার সূত্রপাত ১০ বছর আগে। কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকে পঞ্চায়েত দফতরের অধীনে ভিআরপি (VRP) বা ভিলেজ রিসোর্স পার্সন পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের তদারকির দায়িত্ব পাওয়ার আশায় কৃষ্ণগঞ্জ ব্লকের বহু যুবক পরীক্ষায় বসেন। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, সফল প্রার্থীদের ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের সেই নির্দিষ্ট দিনে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হলেও গোল বাধে ফলাফলের সময় নিয়ে। পরীক্ষা শেষ হতে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেন, পরদিন ইন্টারভিউ নেওয়া হবে।
সেই ঘোষণা অনুযায়ী, পরদিন সকালে চাকরিপ্রার্থীরা কৃষ্ণগঞ্জ বিডিও অফিসে উপস্থিত হন। কিন্তু ইন্টারভিউ চলাকালীনই ঘটে বিপত্তি। অভিযোগ, আচমকাই তৎকালীন শাসকদলের প্রভাবশালী এক ব্যক্তি দলবল নিয়ে ইন্টারভিউ রুমে চড়াও হন। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তাঁরা চাকরিপ্রার্থীদের কার্যত ঘাড় ধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করে দেন। পরবর্তীকালে বিডিও অফিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রশাসনিক কারণে নিয়োগ স্থগিত রাখা হয়েছে। সেই ‘স্থগিত’ আদেশ আর ওঠেনি, আর অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে তলিয়ে যায় কয়েকশ যুবকের ভবিষ্যৎ।
দীর্ঘ এক দশকে কৃষ্ণগঞ্জের এই চাকরিপ্রার্থীরা বিডিও থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ—কোথাও আবেদন করতে বাকি রাখেননি। কিন্তু প্রভাবশালীদের দাপটে প্রতিবারই তাঁদের ফিরতে হয়েছে শূন্য হাতে। গত ১৫ বছরে প্রশাসনের টনক নড়েনি। অবশেষে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন তাঁরা। বর্তমানে কৃষ্ণগঞ্জের বিডিও-কে আবারও ডেপুটেশন জমা দিয়েছেন প্রসেনজিৎ দাস ও অমিও বিশ্বাসের মতো ভুক্তভোগী চাকরিপ্রার্থীরা।
চাকরিপ্রার্থীদের কথায়, “কেন আমাদের সেদিন বের করে দেওয়া হয়েছিল, কার স্বার্থে নিয়োগ আটকে দেওয়া হয়েছিল—তার কোনো উত্তর আজও আমাদের কাছে নেই। সেদিন যারা মারধর করেছিল, তারা ছিল তৎকালীন সরকারের ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি। আমাদের দাবি, বর্তমান সরকার এবং মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী এই মানবিক দিকটি বিবেচনা করুন।” বর্তমান বিডিও তাঁদের কথা শুনেছেন এবং আবেদনপত্রটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছেন। দীর্ঘ দশ বছরের প্রতীক্ষার পর, এই নতুন সরকারের আমলে কি অবশেষে মিলবে নিয়োগপত্র? সেই উত্তরের অপেক্ষায় এখন কৃষ্ণগঞ্জের প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবার।





