‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মহারানি’ বনাম নারীবিদ্বেষ! কল্যাণ-কাকলি দ্বন্দ্বে তোলপাড় তৃণমূলের অন্দরমহল

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ফাটল যেন এখন আর ঢাকার উপায় নেই। লোকসভার মুখ্যসচেতক পদ থেকে সরানো এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোলের পর, এবার সরাসরি দলীয় সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে অভিযোগ দায়ের করে চাঞ্চল্য ছড়ালেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। শুধু অভিযোগই নয়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘নারীবিদ্বেষী’ ও ‘অশালীন’ তকমা দিয়ে তাঁর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন তিনি।

সম্প্রতি লোকসভার অধ্যক্ষকে লেখা এক চিঠিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার অভিযোগ করেন, লোকসভার অভ্যন্তরে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বারবার মৌখিকভাবে হেনস্থা করেছেন। চিঠিতে কাকলি স্পষ্ট লিখেছেন, “আমি আপনার কাছে অভিযোগ দায়ের করার অনুমতি প্রার্থনা করছি, যাতে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়া যায়। তিনি লোকসভার ভিতরে আমাকে বারবার মৌখিকভাবে অপমান করেছেন। তাঁর এই নারীবিদ্বেষী আচরণ বহু মহিলা সাংসদের বিরুদ্ধেই দেখা গিয়েছে। এর উপযুক্ত শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।” কাকলির এই পদক্ষেপ তৃণমূলের অন্দরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে প্রকাশ্যে নিয়ে এল।

ঘটনার সূত্রপাত দলের সাংগঠনিক রদবদলকে কেন্দ্র করে। গত ১৪ মে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠকের পর কাকলিকে সরিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে লোকসভার মুখ্যসচেতক পদে পুনর্বহাল করা হয়। এরপর থেকেই কাকলির রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমশ বেসুরো হয়ে ওঠে। গত মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকে উপস্থিত থাকার পরই তিনি দলীয় সব পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর এই পদত্যাগের পরই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি কাকলিকে নিশানা করেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে কল্যাণ তাঁকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মহারানি’ বলে অভিহিত করেন এবং নারদা কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে এনে কাকলির সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেননি কাকলি ঘোষ দস্তিদার। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, যে দলের অন্দরে একজন মহিলা সাংসদ নিজের সতীর্থের দ্বারাই অশালীন আচরণের শিকার হন এবং ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের কাছ থেকে কোনো সহানুভূতি পান না, সেখানে থাকাটা তাঁর কাছে মর্যাদাহানিকর। রাজনীতির কারবারিদের মতে, কাকলির এই বিদ্রোহ শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সংঘাত নয়, বরং দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও আদর্শগত সংকটের প্রতিফলন।

তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও এই বিষয়ে মুখ খোলেননি। তবে কাকলির এই অভিযোগ যে লোকসভার গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। একদিকে আইনি লড়াইয়ের পথে কাকলি, অন্যদিকে পালটা দুর্নীতির অভিযোগে সরব কল্যাণ—এই দ্বিমুখী আক্রমণ শাসকদলকে যে চূড়ান্ত অস্বস্তিতে ফেলেছে, তা স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয়, শীর্ষ নেতৃত্ব এই সংঘাত থামাতে কী ব্যবস্থা নেন, নাকি এই ফাটল দলের অন্দরে বড় কোনো ভাঙনের সূচনা করে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy