পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড়! মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বপ্নের ‘আব্রাহাম চুক্তি’ (Abraham Accords)-তে যোগ দেওয়ার মার্কিন প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করল পাকিস্তান। ইসলামাবাদ কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, ইজরায়েলের সঙ্গে কোনোভাবেই কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন বা শান্তি চুক্তিতে তারা কোনো অবস্থাতেই স্বাক্ষর করবে না।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি চাঞ্চল্যকর পোস্টের মাধ্যমে সৌদি আরব, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর এবং জর্ডনকে এই ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। ট্রাম্পের দাবি ছিল, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে চলমান শান্তি আলোচনার সঙ্গে এই চুক্তিকে জুড়ে দেওয়াটা পাকিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হবে। অর্থাৎ, ইরান আমেরিকার সঙ্গে চুক্তিতে এলে পাকিস্তানকেও ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে—এমনটাই ছিল মার্কিন প্রশাসনের অলিখিত ইঙ্গিত।
ট্রাম্পের এই কূটনৈতিক চাপের মুখে পাকিস্তান তাৎক্ষণিক ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ ‘সমা টিভি’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। অত্যন্ত কড়া ভাষায় খাজা আসিফ বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে আমাদের এমন কোনো চুক্তির অংশ হওয়া উচিত, যা আমাদের দেশের মূল আদর্শ এবং নীতির পরিপন্থী। ইজরায়েলকে আমরা বিশ্বাস করি না। যাদের কথার এক দিনের জন্যও ভরসা করা যায় না, তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রশ্নই ওঠে না।”
এদিকে, পাকিস্তানের উচ্চপদস্থ কূটনৈতিক সূত্রের মতে, আমেরিকার ইরান শান্তি আলোচনা এবং আব্রাহাম চুক্তির সদস্যপদকে এক করে ফেলার চেষ্টাটা একেবারেই ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। সূত্রটি স্পষ্ট করেছে যে, এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা এবং এদের গুলিয়ে ফেলার কোনো আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পাকিস্তানের নেই। ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম দফার শাসনামলে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছিল। এবার দ্বিতীয় দফার ক্ষমতায় ট্রাম্প এই চুক্তির পরিধি বিস্তারে উঠেপড়ে লেগেছেন।
উল্লেখ্য, পাকিস্তানের এই কড়া অবস্থান নতুন কিছু নয়। বিশ্বের সেই হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে পাকিস্তান অন্যতম, যারা ইজরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবেই স্বীকৃতি দেয় না। তাদের পাসপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ থাকে যে, “এই পাসপোর্ট ইজরায়েল ছাড়া বিশ্বের সমস্ত দেশের জন্য বৈধ।” যদিও ট্রাম্পের আমন্ত্রিত বাকি পাঁচটি দেশ (সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, মিশর ও জর্ডন) এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি, তবে বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, ইজরায়েলের প্রতি এই মুসলিম প্রধান দেশগুলোর সাধারণ জনগণের গভীর অবিশ্বাস ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনায় এক বড় ধাক্কা। পাকিস্তানের এই অনড় মনোভাব মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান কূটনৈতিক সমীকরণে এক নতুন ও জটিল সমীকরণ তৈরি করল।





