রাজ্যে দাগি অপরাধীদের গ্রেফতারের পর অন্তর্বাসে প্রকাশ্যে প্যারেড করানোর ঘটনা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে তুঙ্গে উঠেছে বিতর্ক। পুলিশের এই কঠোর পদক্ষেপকে সরাসরি ‘বর্বর মানসিকতা’ বলে অভিহিত করেছেন তৃণমূল সাংসদ ও প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে তিনি প্রশাসনের এই ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন। কল্যাণ স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি অপরাধ বা অপরাধীকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না, কিন্তু অভিযুক্ত বা অপরাধী যেই হোক না কেন, তার প্রতি অমানবিক আচরণ আইনের শাসন ও মানবাধিকারের পরিপন্থী।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্যের একাধিক প্রান্ত থেকে পুলিশি হেনস্তার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। পুলিশের একাংশের দাবি, অপরাধীদের মনে ভয় ধরাতে এবং সমাজকে কড়া বার্তা দিতেই এই ধরনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, আইনের শাসন এবং বিনোদনের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। তিনি লেখেন, “সরকার যদি অতিরিক্ত ক্ষমতা পুলিশকে দেয় এবং পুলিশ সেই ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করে, তবে ন্যায়বিচারের জায়গা দখল করে বর্বরতা।” তাঁর মতে, তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তকে দড়ি বেঁধে বা অন্তর্বাস পরিয়ে জনসমক্ষে ঘোরানো সংবিধানের মৌলিক অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। শাসকদলের অন্দরেই তৈরি হয়েছে মতপার্থক্য। একপক্ষ মনে করছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রুখতে পুলিশের কঠোর হওয়া প্রয়োজন এবং সাধারণ মানুষ পুলিশের এই ‘বড় দাওয়াই’ সমর্থন করছে। অন্যদিকে, দলের একাংশ ও প্রবীণ আইনজীবীরা মনে করছেন, আদালত দোষী সাব্যস্ত করার আগে পুলিশের এই ধরনের ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ বা প্রকাশ্যে অপমান গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক।
কল্যাণ আরও কড়া ভাষায় লেখেন, “কোনো সরকার যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ না করে সার্কাস দলের মতো আচরণ শুরু করে, তবে সাধারণ মানুষ ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে।” তাঁর এই বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে মানবাধিকার কর্মীরাও সরব হয়েছেন। তাঁদের দাবি, ভারতীয় সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের মর্যাদা রক্ষার অধিকার দিয়েছে। অপরাধী বা অভিযুক্ত—কেউই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার রাখে না, এবং পুলিশও তার ঊর্ধ্বে নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, তদন্ত চলাকালীন এই ধরনের অমানবিক আচরণ ভবিষ্যতে আদালতে বড়সড় আইনি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। পুলিশের এই ‘কড়া বার্তা’ আখেরে আইনের মর্যাদা রক্ষা করছে নাকি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করছে, তা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় শুরু হয়েছে তীব্র তর্জা। একদিকে জনরোষ সামলানোর দাবি, অন্যদিকে সাংবিধানিক সৌজন্য—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রাজ্য প্রশাসন এখন এক চরম সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।





