বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালের মুকুটে যুক্ত হলো এক গর্বের পালক। প্রতিষ্ঠার ৫৯ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার হাসপাতালের চিকিৎসকরা মেরুদণ্ডের হাড়ের (Spine) অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন করলেন। অর্থোপেডিক সার্জন ডঃ সমীর জানার নেতৃত্বে আয়োজিত এই বিশেষ মেডিক্যাল অভিযানে দুটি পৃথক অস্ত্রোপচার করা হয়, যার মধ্যে একটি তিন ঘণ্টার এবং অন্যটি দুই ঘণ্টার দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল। সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামোয় এই সাফল্য নিঃসন্দেহে জেলা স্বাস্থ্য পরিষেবার এক নতুন মাইলফলক।
সাফল্যের পেছনের গল্প:
এই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বাঁকুড়ার পচাডহরা গ্রামের বাসিন্দা রামপদ পাল। পেশায় কৃষক রামপদবাবু সাত-আট বছর আগে মেরুদণ্ডে গুরুতর আঘাত পান। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও যখন সুরাহা মেলেনি, তখন চিকিৎসকরা তাঁকে বড়সড় অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন, যার আনুমানিক খরচ ছিল দেড় থেকে দুই লক্ষ টাকা। চরম দারিদ্র্যের কারণে যা ছিল এই কৃষকের পক্ষে অসম্ভব। গত ছয় মাস আগে তিনি বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালের আউটডোরে ডঃ সমীর জানার শরণাপন্ন হন। চিকিৎসক তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে এই চিকিৎসা সম্ভব।
ঠিক একই সময়ে বিষ্ণুপুর থানার সুমন্ত মান্না নামে আরও এক রোগী আম গাছ থেকে পড়ে গিয়ে মেরুদণ্ডে মারাত্মক আঘাত পান। হাসপাতালের এই দুই চ্যালেঞ্জিং রোগীকে সুস্থ করে তোলার লক্ষ্যে হাসপাতাল সুপার এবং সিএমওএইচ (CMOH) দ্রুত উদ্যোগী হন। বিষ্ণুপুর হাসপাতালে আগে এই ধরনের জটিল অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ছিল না। কিন্তু প্রশাসনিক তৎপরতায় কলকাতা স্বাস্থ্য দফতর থেকে অতি দ্রুত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনা হয়। চিকিৎসকদের নিয়ে একটি বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয় এবং শেষপর্যন্ত রবিবার গভীর রাতে সাফল্যের সঙ্গে দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।
চিকিৎসকদের বার্তা:
হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে উভয় রোগীই স্থিতিশীল এবং তাঁদের কঠোর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এই সাফল্যে খুশি রোগীর পরিবারের সদস্যরা। দরিদ্র মানুষেরা যারা অর্থাভাবে বড় হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে ভয় পান, তাঁদের উদ্দেশ্যে চিকিৎসক এবং রোগীর আত্মীয়রা বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তাঁরা বলেন, “সরকারি হাসপাতালের ওপর ভরসা রাখুন। আজ সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা আগের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও উন্নত।”
এই অস্ত্রোপচার বিষ্ণুপুর জেলা হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাল। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, জেলা হাসপাতালেই যদি এমন উন্নত চিকিৎসা সম্ভব হয়, তবে রোগীদের আর কলকাতায় রেফার হওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। যা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে সাধারণ মানুষের আরও দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে।





