মেঘলা আকাশ, ঝিরঝিরে হাওয়া আর বৃষ্টির ছোঁয়া— বর্ষার এই মরশুম বাঙালির অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু এই মনোরম আবহাওয়ার আড়ালেই ওত পেতে থাকে এক মারাত্মক বিপদ। বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতি বছর দেশজুড়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এক চেনা আতঙ্ক, যার নাম ‘ডেঙ্গু’। এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো এই ভাইরাস জ্বর প্রতি বছরই বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। একটু অসাবধানতা আর ঘরের কোণে জমে থাকা জলই এই নীরব ঘাতককে ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট।
তাই বর্ষার শুরুতেই ডেঙ্গুর হাত থেকে নিজেকে এবং পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে আমাদের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
কেন বর্ষাকালেই বাড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ?
ডেঙ্গু ভাইরাসের বাহক হলো স্ত্রী ‘এডিস ইজিপ্টাই’ (Aedes aegypti) মশা। এই মশার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা সাধারণত পরিষ্কার এবং স্থির জলে ডিম পাড়ে। বর্ষাকালে বাড়ির চারপাশের নিচু জায়গা, ছাদ, ফুলের টব, টায়ার বা ডাবের খোলার মতো জিনিসে সহজেই বৃষ্টির জল জমা হয়। আর এই জমে থাকা জলই হয়ে ওঠে এডিস মশার বংশবৃদ্ধির আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র। বৃষ্টি থামার পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এই ডিম থেকে মশার জন্ম হয় এবং তা ডেঙ্গুর প্রকোপ হু হু করে বাড়িয়ে দেয়।
ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণগুলো কী কী?
চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ ভাইরাল ফিভার আর ডেঙ্গুর মধ্যে পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণত এডিস মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ৭ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলি প্রকাশ পায়:
আচমকা তীব্র জ্বর (১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে)।
চোখের পেছনের অংশে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়া।
মাথা ব্যথা, পেশি এবং হাড়ের জয়েন্টে অসহ্য যন্ত্রণা (তাই একে ‘ব্রেক-বোন ফিভার’ বা হাড়ভাঙা জ্বরও বলা হয়)।
শরীরে লালচে র্যাশ বা অ্যালার্জির মতো দাগ দেখা দেওয়া।
অনবরত বমি ভাব বা বমি হওয়া এবং চরম ক্লান্তি।
সবচেয়ে বিপজ্জনক লক্ষণ: ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নিলে রোগীর রক্তে প্লেটলেট (Platelet) কাউন্ট দ্রুত কমতে শুরু করে। দাঁতের মাড়ি, নাক বা বমির সঙ্গে রক্তপাত হলে কিংবা পেটব্যথা হলে তা ‘ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার’-এর লক্ষণ, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাঁচবার উপায়: আজই নিন এই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
ডেঙ্গুর কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা ভ্যাকসিন আমাদের দেশে সহজলভ্য নয়, তাই ‘প্রতিরোধই হলো একমাত্র প্রতিকার’।
জল জমতে দেবেন না: প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ির চারপাশ ঘুরে দেখুন। ফুলের টব, ভাঙা প্লাস্টিকের বালতি, এসির ট্রে বা কুলারের জল নিয়মিত পরিষ্কার করুন। ‘ড্রাই ডে’ বা শুকনো দিন পালন করে জল জমতে না দেওয়াটাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
মশারি ব্যবহার করুন: এডিস মশা মূলত দিনের বেলা, বিশেষ করে সূর্যোদয়ের পর এবং সূর্যাস্তের ঠিক আগে কামড়ায়। তাই দিনে বা রাতে, ঘুমানোর সময় অবশ্যই মশারি ব্যবহার করুন।
সতর্ক পোশাক: বর্ষার মরশুমে ফুল হাতা জামা এবং ফুল প্যান্ট পরার চেষ্টা করুন, যাতে শরীরের বেশিরভাগ অংশ ঢাকা থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই বিষয়ে বাড়তি নজর দিন।
মসকিউটো রিপেলেন্ট: ঘর থেকে বেরোনোর সময় মশা তাড়ানোর ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করতে পারেন। ঘরে লিকুইড ভেপোরাইজার বা মসকিউটো কয়েল ব্যবহার করুন।
ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নয়: জ্বর হলে ভুলেও নিজে নিজে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন জাতীয় ব্যথানাশক (Painkiller) ওষুধ খাবেন না। এতে রক্তপাতের ঝুঁকি বেড়ে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শুধুমাত্র প্যারাসিটামল খান এবং প্রচুর পরিমাণে জল, ডাবের জল ও ওআরএস (ORS) পান করুন।




