সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের অন্যতম সহজ চাবিকাঠি হলো হাঁটা। এই একটি মাত্র সাধারণ অভ্যাসের মাধ্যমে শরীর ও মন— দুই-ই চাঙ্গা রাখা সম্ভব। নিয়মিত নিয়ম মেনে হাঁটলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, হৃদযন্ত্র সচল থাকে এবং দৈনন্দিন মানসিক চাপও অনেকটাই কমে। তবে চিকিৎসকদের মতে, সব বয়সের মানুষের জন্য হাঁটার সময়, দূরত্ব এবং গতি কখনই এক হওয়া উচিত নয়। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে হাঁটার ধরন বদলে ফেলা জরুরি। তাই সুস্থ থাকতে কোন বয়সে ঠিক কতটা ও কীভাবে হাঁটা উচিত, তা আমাদের প্রত্যেকেরই জেনে রাখা প্রয়োজন।
তরুণ বয়সে চাই ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’ (১৮ থেকে ৪০ বছর)
১৮ থেকে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত মানবশরীর সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ও এনার্জেটিক থাকে। এই বয়সে নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস শুধু শরীরকে ফিট রাখে না, বরং ভবিষ্যৎ জীবনের একাধিক ক্রনিক রোগের ঝুঁকিও এক ধাক্কায় কমিয়ে দেয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সের জাতক-জাতিকাদের প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পর্যন্ত হাঁটা উচিত। যাঁরা নতুন শুরু করছেন, তাঁরা প্রথমে ৩০ মিনিট দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন।
এই বয়সীদের জন্য দ্রুত গতিতে হাঁটা বা ‘ব্রিস্ক ওয়াকিং’ (Brisk Walking) সবচেয়ে বেশি কার্যকর। এতে শরীরের মেদ বা অতিরিক্ত ক্যালরি দ্রুত ঝরে যায় এবং হার্ট শক্তিশালী হয়। বিশেষ করে যাঁরা আইটি সেক্টরে বা অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন, তাঁদের স্থূলতা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের হাত থেকে বাঁচতে প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা বাধ্যতামূলক।
ম্যাজিক দেখাবে ‘ইন্টারভাল ওয়াকিং’ (Interval Walking)
৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের জন্য ‘ইন্টারভাল ওয়াকিং’ বা বিরতি দিয়ে হাঁটার পদ্ধতিটি অত্যন্ত উপকারী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই পদ্ধতিতে প্রথমে কিছুক্ষণ খুব দ্রুত হাঁটা হয়, তারপরের কয়েক মিনিট গতি কমিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে শরীরকে একটু বিশ্রাম দেওয়া হয়। এরপর আবার দ্রুত হাঁটা শুরু করতে হয়। এই বিশেষ অভ্যাসের ফলে শরীরের সহনশীলতা বা স্ট্যামিনা বাড়ে এবং মেদ ঝরার (Calorie Burn) হার দ্বিগুণ হয়ে যায়। যাঁরা সময়ের অভাবে জিমে যেতে পারেন না, তাঁদের কার্ডিও-র বিকল্প হিসেবে এই পদ্ধতি দারুণ কাজ করে।
৪০ পার হলেই হাঁটুন সচেতনভাবে (৪০ থেকে ৬০ বছর)
চল্লিশের কোঠায় পা দেওয়ার পর থেকেই মানবশরীরে হরমোন ও হাড়ের নানা পরিবর্তন শুরু হয়। এই সময় অনেকেরই হাঁটু, গোড়ালি বা কোমরের সমস্যা দেখা দেয়। তাই এই বয়সে শরীরের ওপর অতিরিক্ত জোর না দিয়ে ক্ষমতা বুঝে হাঁটা দরকার। চিকিৎসকদের মতে, ৪০ থেকে ৬০ বছর বয়সে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট হাঁটা আদর্শ।
খুব দ্রুত না হেঁটে এই বয়সে মাঝারি গতি বজায় রাখলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হাড়ের ঘনত্ব (Bone Density) বজায় থাকে। ৪৫ মিনিট পর্যন্ত হাঁটা যেতেই পারে, তবে তা যেন কোনওভাবেই শরীরের ওপর বাড়তি ধকল তৈরি না করে।
৬০ বছরের পর ধীর গতিই নিরাপদ (৬০ ঊর্ধ্ব বয়স)
বয়স্কদের ক্ষেত্রে হাঁটার সময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত শারীরিক নিরাপত্তার ওপর। ৬০ বছরের পর অতিরিক্ত দ্রুত হাঁটলে হার্ট বা জয়েন্টের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এই বয়সে আরামদায়ক ও ধীর গতিতে হাঁটা সবচেয়ে নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ নাগরিকরা দিনে ২০ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটলেই জয়েন্ট বা গেঁটে বাত শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে দূরে থাকতে পারবেন। আমেরিকার বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার থেকে ৭ হাজার ৫০০ পদক্ষেপ (Steps) হাঁটলেই নিখুঁত স্বাস্থ্য বজায় রাখা সম্ভব। এর চেয়ে বেশি হাঁটলে যে অতিরিক্ত কোনও শারীরিক উপকার মিলবে, গবেষণায় এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হাঁটার আগে ও পরে কী করবেন?
হাঁটার মতো সহজ ব্যায়ামেরও কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে, যা না মানলে পেশিতে টান ধরতে পারে।
শুরু ও শেষ: হাঁটা শুরু করার প্রথম ৫ মিনিট সবসময় ধীর গতিতে হেঁটে শরীরকে ‘ওয়ার্ম আপ’ করে নেওয়া উচিত। একইভাবে হাঁটা শেষ করার ঠিক আগের কয়েক মিনিট গতি কমিয়ে ধীরে ধীরে থামতে হবে, যাতে হার্ট রেট স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
স্ট্রেচিং: হাঁটার পর্ব চুকে যাওয়ার পর হালকা স্ট্রেচিং করলে পায়ের পেশি আরাম পায়।
পোশাক ও জুতো: হাঁটার সময় সবসময় ঢিলেঢালা সুতির পোশাক এবং সঠিক মাপের নরম স্পোর্টস শু বা ওয়াকিং জুতো ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি।
বয়স যাই হোক না কেন, প্রতিদিনের ব্যস্ত সময় থেকে অন্তত কিছুটা সময় হাঁটার জন্য বের করে নিলে তার ইতিবাচক প্রভাব আপনার শরীর ও মনে পড়তে বাধ্য। তাই আজই নিজের বয়স অনুযায়ী সঠিক নিয়মটি বেছে নিন এবং সুস্থ থাকুন।





