বাংলায় টানা দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা এবং লাগাতার ভোটব্যাংক সঙ্কুচিত হওয়ার পর, এবার অস্তিত্ব রক্ষায় নিজেদের দীর্ঘদিনের চেনা নীতিতে ঐতিহাসিক বদল আনার পথে হাঁটছে সিপিএম। রাজ্যে গেরুয়া শিবিরের উত্থান এবং তৃণমূলের ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির মোকাবিলা করতে এবার আর ধর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখা নয়, বরং সরাসরি মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগের অংশ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
সম্প্রতি সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের উপস্থিতিতে দলের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই নিয়ে বিস্তারিত ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছে। ঠিক হয়েছে, দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং জনবিচ্ছিন্নতা কাটাতে এবার স্থানীয় মন্দির, মসজিদ ও বিভিন্ন পুজো কমিটির ভেতরে নিজেদের জায়গা করে নেবেন বাম নেতা-কর্মীরা।
ত্রুটি খুঁজতে ও সংশোধনে এবার বুথমুখী আলিমুদ্দিন
দলীয় সূত্রে খবর, বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণ করে নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে যে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ এবং সামাজিক উৎসব থেকে বামেদের দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণেই বিজেপি ও তৃণমূল সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিয়েছে। এই ভুল সংশোধন করতেই এবার বুথ স্তরে বিশেষ অভিযান শুরু করছে সিপিএম। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ-বিক্ষোভ এবং দলের ত্রুটি খতিয়ে দেখতে দলের ওপরতলার নেতারা সরাসরি বুথ স্তরে পৌঁছাবেন। মানুষের সঙ্গে জনসংযোগ বাড়িয়ে দলের হারিয়ে যাওয়া জমি পুনরুদ্ধার করাই এর মূল লক্ষ্য।
বিজেপির মোকাবিলায় মন্দির-মসজিদ কমিটিই হাতিয়ার!
সিপিএম-এর দীর্ঘদিনের দস্তুর ছিল, দলের কোনো সক্রিয় সদস্য বা পদাধিকারী কোনো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা পুজো কমিটির সামনের সারিতে থাকতেন না। বড়জোর পুজোর দিনগুলোতে মণ্ডপের বাইরে বুক স্টল দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত বামেদের ধর্মীয় সংযোগ। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সেই অবস্থানকে আত্মঘাতী বলেই মনে করছেন সেলিমরা।
বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, পাড়ার পুজো কমিটি, মন্দির বা মসজিদের পরিচালনা কমিটিগুলোতে যদি বাম মনোভাবাপন্ন বা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ না থাকেন, তবে সেই জায়গাগুলো অনায়াসেই আরএসএস বা বিজেপি দখল করে নিচ্ছে। আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে তীব্র মেরুকরণ। এই মেরুকরণ রুখতে এবং বিজেপির ধর্মীয় আবেগের তাস ভেস্তে দিতে এবার থেকে পুজো ও ধর্মীয় কমিটিগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন সিপিএম কর্মীরা।
রাজনৈতিক মহলে তুমুল চর্চা
কট্টর মার্ক্সবাদী ভাবধারা এবং নাস্তিকতার তত্ত্ব ঝেড়ে ফেলে সিপিএম-এর এই আকস্মিক ‘ধর্মীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি’-র সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কেরলে বামেরা যেভাবে ওনাম বা অন্য সামাজিক-ধর্মীয় উৎসবে অগ্রণী ভূমিকা নেয়, ঠিক সেই মডেলই এবার বাংলায় প্রয়োগ করতে চাইছেন মহম্মদ সেলিমরা। তবে এই কৌশলের মাধ্যমে তারা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের হাওয়া কতটা রুখতে পারবেন এবং সাধারণ মানুষ বামেদের এই ভোলবদলকে কীভাবে গ্রহণ করবেন, তা সময়ই বলবে।





