হাজার বছর পর ঘুচল কলঙ্ক! নেদারল্যান্ডস থেকে ভারতের কোন মহা-গুপ্তধন উদ্ধার করলেন মোদি?

বিশ্বমঞ্চে ভারতের কূটনৈতিক লড়াইয়ের মুকুটে যুক্ত হলো আরও একটি সোনালী পালক। দীর্ঘ ১৪ বছরের টানাপোড়েন এবং আইনি প্রক্রিয়ার পর অবশেষে ডাচদের হাত থেকে উদ্ধার হলো ভারতের হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস। দক্ষিণ ভারতের প্রতাপশালী চোল সাম্রাজ্যের অত্যন্ত মূল্যবান ও ঐতিহাসিক ‘আনাইমঙ্গলম তাম্রশাসন’ (যা ইউরোপে ‘লেইডেন প্লেটস’ নামে পরিচিত) ভারতের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দিল নেদারল্যান্ডস সরকার।

নেদারল্যান্ডস সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তুলে দেন ডাচ প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাগ করে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি আবেগঘন বার্তায় একে ‘প্রত্যেক ভারতীয়র জন্য এক চরম আনন্দের ও গর্বের মুহূর্ত’ বলে অবিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ডাচ সরকার এবং সে দেশের ঐতিহ্যবাহী লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান।

কী এই ‘আনাইমঙ্গলম তাম্রশাসন’? কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতের বাইরে সংরক্ষিত তামিল ও ভারতীয় ঐতিহ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অকাট্য দলিলগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই সংগ্রহে রয়েছে মোট ২১টি বড় এবং ৩টি ছোট তাম্রফলক, যার সম্মিলিত ওজন প্রায় ৩০ কিলোগ্রাম। এই বিশাল তামার ফলকগুলো একটি মজবুত ব্রোঞ্জের বৃত্তাকার রিং দিয়ে একসঙ্গে বাঁধা রয়েছে। আর সেই রিংয়ের ওপর খোদাই করা আছে চোল সাম্রাজ্যের পরাক্রমশালী শাসক রাজেন্দ্র চোলের রাজকীয় সিলমোহর।

এই ফলকগুলোর লিপি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—একটি অংশ সংস্কৃত ভাষায় এবং অন্য অংশটি প্রাচীন তামিল ভাষায় লেখা। এই লিপিতে তৎকালীন চোল সাম্রাজ্যের বিখ্যাত সম্রাট রাজরাজা চোল (১ম) এবং তাঁর পুত্র রাজেন্দ্র চোলের শাসনকালের শাসনতান্ত্রিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের বিবরণ রয়েছে।

১৭০০ খ্রিস্টাব্দে চুরি যাওয়া ইতিহাস

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১০০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে সম্রাট রাজরাজা চোল নাগাপট্টিনমের একটি বৌদ্ধ বিহারের জন্য ভূমি ও কর দানের যে মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর পুত্র রাজেন্দ্র চোল পরে তা স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য এই তাম্রফলকগুলোতে খোদাই করিয়েছিলেন। কিন্তু ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে নাগাপট্টিনম যখন ডাচদের শাসনাধীনে চলে যায়, তখন ফ্লোরেন্তিয়াস ক্যাম্পার নামের এক ডাচ মিশনারি এই অমূল্য সম্পদটি কৌশলে ভারতে থেকে নেদারল্যান্ডসে পাচার করে দেন। ১৮৬২ সাল থেকে এই ফলকগুলো নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গোপন ও নিরাপদ ভল্টে বন্দি ছিল।

ইউনেস্কোর হস্তক্ষেপ ও ভারতের জয়

২০১২ সাল থেকে ভারত সরকার এই ঐতিহাসিক লিপি দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক স্তরে চেষ্টা শুরু করে। ২০২৩ সালে ইউনেস্কোর (UNESCO) একটি বিশেষ আন্তঃসরকারি কমিটি ভারতকে এই নিদর্শনের প্রকৃত ‘উৎস দেশ’ বা মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং নেদারল্যান্ডসকে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে তা ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানায়। অবশেষে, ২০২৬ সালে এসে ভারতের সেই দীর্ঘ কূটনৈতিক লড়াই সফল হলো। এই অমূল্য প্রত্নসম্পদের দেশে ফেরা কেবল ইতিহাসের পুনরুদ্ধার নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে ভারতের বাড়তে থাকা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবেরই এক অকাট্য প্রমাণ।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy