ভিনগ্রহে প্রাণের খোঁজ! ইজরায়েলি বিজ্ঞানীদের কোন আবিষ্কারে তোলপাড় মহাবিশ্ব?

মহাবিশ্বে কি আমরা সত্যিই একা? নাকি আমাদের অজান্তেই কোনো দূরবর্তী গ্রহে গড়ে উঠেছে অন্য কোনো সভ্যতা বা প্রাণের অস্তিত্ব? এই চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বছরের পর বছর ধরে মহাকাশে চোখ রেখে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। এবার সেই অনুসন্ধানের পথেই এল এক যুগান্তকারী মোড়। এলিয়েন বা ভিনগ্রহের প্রাণের খোঁজে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করলেন ইজরায়েলের বিজ্ঞানীরা, যা আগামী দিনে মহাকাশ গবেষণার খোলনলচে বদলে দিতে পারে।

এতদিন পর্যন্ত পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব বা ‘বায়োসিগনেচার’ খুঁজতে বিজ্ঞানীরা মূলত অ্যামিনো অ্যাসিড বা ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো জৈব রাসায়নিক অণুর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এই পদ্ধতির একটি বড় খামতি ছিল। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, কোনো জীবন্ত কোশের উপস্থিতি ছাড়াও কেবল সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমেও এই অণুগুলো তৈরি হতে পারে। ফলে, শুধু এদের উপস্থিতি দেখে প্রাণের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা অসম্ভব ছিল।

এই জটিল সমস্যার এক অভিনব সমাধান সূত্র বের করেছেন ইজরায়েলের বিখ্যাত ‘ওয়াইজম্যান ইনস্টিটিউট’-এর বিজ্ঞানী গিডিওন ইয়োফে এবং তাঁর গবেষক দল। বিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে প্রকাশিত একটি গবেষণা রিপোর্টে তাঁরা দাবি করেছেন, শুধু রাসায়নিকের উপস্থিতি নয়, বরং সেই অণুগুলো কীভাবে সেজে রয়েছে (বিন্যাস) এবং তাদের মধ্যে কতটা বৈচিত্র্য আছে—সেটাই হলো আসল চাবিকাঠি।

গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীরা গ্রহাণু, উল্কাপিণ্ড, বিভিন্ন অণুজীব, মাটি এবং প্রাচীন জীবাশ্মসহ প্রায় ১০০টি ভিন্ন ভিন্ন নমুনা পরীক্ষা করেন। সেখান থেকেই উঠে আসে এক চমকপ্রদ তথ্য। বিজ্ঞানী গিডিওন ইয়োফে জানান, জীবন্ত কোনো উৎস থেকে তৈরি অ্যামিনো অ্যাসিডের মধ্যে এক অদ্ভুত এবং সুনির্দিষ্ট বিন্যাস থাকে, যা অজৈব পদ্ধতিতে তৈরি অণুর মধ্যে দেখা যায় না। অন্যদিকে, প্রাণহীন উৎস থেকে আসা ফ্যাটি অ্যাসিডের গঠন হয় অত্যন্ত অগোছালো।

সবচেয়ে আশার কথা হলো, কোটি কোটি বছর পার হয়ে গেলেও এই বিশেষ গঠনের কোনো পরিবর্তন হয় না। এমনকি ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্মেও এই বিশেষ জৈব-রাসায়নিক গঠনের স্পষ্ট ছাপ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এর ফলে গবেষকদের ধারণা, লাল গ্রহ মঙ্গলের বুকে যদি কোটি কোটি বছর আগেও কোনো প্রাচীন অণুজীবের অস্তিত্ব থেকে থাকে, তবে এই নতুন পদ্ধতিতে তার প্রমাণ পাওয়া এখন সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

বিজ্ঞানীদের এই নতুন আবিষ্কার আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার (NASA) আগামী মিশনগুলোর সাফল্যকে আরও বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে নাসার ‘ইউরোপা ক্লিপার’ (Europa Clipper) মিশনের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে চলেছে। বৃহস্পতির রহস্যময় উপগ্রহ ‘ইউরোপা’-র দিকে ইতিমধ্যেই রওনা দিয়েছে নাসার এই মহাকাশযান। বিজ্ঞানীদের একাংশের বিশ্বাস, ইউরোপার পুরু বরফের চাদরের নিচে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল মহাসাগর, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত মহাসাগরের সম্মিলিত জলের চেয়েও দ্বিগুণ জল রয়েছে। ফলে সেখানে প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা প্রবল।

হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে নাসার এই মহাকাশযান ইউরোপায় পৌঁছাবে। ইউরোপা ক্লিপারে এমন কিছু আধুনিক যন্ত্র রয়েছে যা উপগ্রহটির পৃষ্ঠ থেকে ছিটকে আসা বরফের কণা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করতে পারবে। ইজরায়েলি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এই নতুন ‘বায়োসিগনেচার’ পদ্ধতি ব্যবহার করে সেই বরফের কণার ভেতরের অ্যামিনো অ্যাসিডের নিখুঁত বিন্যাস বিশ্লেষণ করা যাবে। এর ফলে মহাবিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে প্রাণের স্পন্দন রয়েছে কি না, তা এবার আরও নির্ভুলভাবে প্রমাণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী বিজ্ঞান মহল।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy