পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বাজাউর জেলায় মাঝরাতে নেমে এল এক চরম বিপর্যয়। এক লহমায় খতম হয়ে গেল অন্তত ১৫ জন পাকিস্তানি সেনা জওয়ানের জীবন। বাজাউরের লই মামন্দ এলাকার দামাঙ্গি স্কাউটস ক্যাম্প লক্ষ্য করে চালানো এক সুপরিকল্পিত এবং বিধ্বংসী আত্মঘাতী হামলায় (Suicide Attack) কেঁপে উঠল গোটা পাকিস্তান। বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে এসে জঙ্গিরা ধাক্কা মারে সেনা ক্যাম্পের মূল ফটকে। এর পরেই শুরু হয় সেনা ও জঙ্গিদের মধ্যে তুমুল মুখোমুখি গুলির লড়াই। স্থানীয় সুত্র থেকে জানা গেছে, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এখনো সেখানে ভারী সংঘর্ষ চলছে এবং হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, রাতের অন্ধকারের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎই এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। ক্যাম্পের প্রধান প্রবেশদ্বারের কাছে এসে তীব্র গতিতে ধাক্কা মারে বিস্ফোরকভর্তি ওই আত্মঘাতী গাড়িটি। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশে উঠে পড়ে এবং চারপাশে ধোঁয়া ও ধুলোয় ঢেকে যায় সবকিছু। বিস্ফোরণের রেশ কাটার আগেই ভারী অস্ত্রে সজ্জিত জঙ্গিরা ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং কর্তব্যরত নিরাপত্তা কর্মীদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। আচমকা এই হামলায় হতচকিত হয়ে পড়লেও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও ফ্রন্টিয়ার কর্পসের জওয়ানেরা।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এখনো এই হামলার সম্পূর্ণ বিবরণ সরকারিভাবে প্রকাশ করা না হলেও, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং গোয়েন্দা সূত্রে স্পষ্ট যে, এই নাশকতার পেছনে রয়েছে কুখ্যাত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP)। ইতিমধ্যেই টিটিপির বাজাউর অধ্যায়ের কমান্ডার মালাং বাচা অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। জঙ্গি সংগঠনটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, পাকিস্তানি ফৌজ সম্প্রতি আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশে যে বিশেষ সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, এটি তারই পাল্টা প্রতিশোধ।
এদিকে ঘটনার পরেই এলাকায় চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হামলার খবর পেয়ে সেনা ক্যাম্পের দিকে রওনা হওয়া একটি উদ্ধারকারী দলের ওপরও মাঝরাস্তায় অ্যামবুশ করে জঙ্গিরা। এর ফলে উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বর্তমানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টারগুলো উপদ্রুত এলাকার আকাশে টহল দিচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন পুরো বাজাউর জেলায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং বিশাল সেনা ও পুলিশ বাহিনী দিয়ে এলাকাটি কর্ডন করে ফেলা হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেরই অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে বাজাউর জেলাটি দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র জঙ্গি তৎপরতার জন্য কুখ্যাত। আফগান সীমান্তের একদম কাছাকাছি হওয়ায় এখানে টিটিপি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর অবাধ আনাগোনা রয়েছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফগানিস্তানে তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই সীমান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। পাকিস্তান বারবার আফগান তালিবান সরকারকে তাদের মাটিতে জঙ্গিদের আশ্রয় না দেওয়ার আহ্বান জানালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই বর্বরোচিত ও বড়সড় হামলার পর ইসলামাবাদ এবং কাবুলের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।





