ভোটের ফল প্রকাশের পর বাংলায় রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। বঙ্গে এখন নতুন সরকার, মসনদে বসেছে গেরুয়া শিবির। আর এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আবহে টলিউডের অন্দরেও শুরু হয়েছে নতুন সমীকরণ। বিশেষ করে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত যে সমস্ত শিল্পীরা ছিলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মহলে চর্চা চলছে। এই পরিস্থিতিতে এবার সরাসরি নতুন সরকারের কাছে নিজের স্পষ্ট দাবি ও প্রত্যাশার কথা জানিয়ে মুখ খুললেন জাতীয় পুরস্কার জয়ী জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তী। বাম-ডান বা সবুজ-গেরুয়া নয়, একজন খাটি পেশাদার শিল্পী হিসেবে টলিউডের ভবিষ্যৎ এবং সংগীত জগতের স্বার্থে ঠিক কী চান তিনি, তা নিয়ে অকপট গায়িকা।
ইমন চক্রবর্তী স্পষ্ট জানান, নতুন সরকারের কাছে তাঁর প্রধান চাওয়া হলো শিল্পীদের কাজের সুযোগ। তিনি বলেন, ”আমাদের আরও অনেক বেশি করে শো হোক। লাইভ শো আমাদের প্রত্যেক শিল্পীর উপার্জনের রাস্তা। রেকর্ডিং বা অন্য কাজে উপার্জনের রাস্তা এতটা খোলা থাকে না, যেটা খোলা থাকে শোয়ের ক্ষেত্রে।” কোনো রকম রাখঢাক না করেই ইমন মনে করিয়ে দেন যে, স্টুডিও রেকর্ডিং বা অন্যান্য অন-স্ক্রিন কাজ থেকে শিল্পীদের যে উপার্জন হয়, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি এবং স্থায়ী রুটিরুজি নির্ভর করে লাইভ স্টেজ পারফরম্যান্সের ওপর। তাই বঙ্গে নতুন শাসনভার আসলেও যাতে সংস্কৃতির এই ধারা ব্যাহত না হয়, সেটাই তাঁর প্রধান আর্জি।
একই সঙ্গে টলিউডের রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং দলদাসের তকমা নিয়েও বার্তা দিয়েছেন গায়িকা। নতুন জমানায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কোনো শিল্পী যাতে কাজ থেকে বঞ্চিত না হন, সেই আশঙ্কা প্রকাশ করে ইমন বলেন, ”আমি চাইব দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক শিল্পী যাতে কাজ করতে পারেন। আমি চাইব বাংলায় আরও বেশি করে কাজ আসুক।” তাঁর এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহল। কারণ, নতুন সরকার আসার পর ইমনের মতো আরও অনেক শিল্পীই এখন আশাবাদী যে, কে কোন দলের সমর্থক বা অতীতে কার হয়ে প্রচার করেছেন, তা কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বা পেশাদারিত্বের জায়গায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে না।
উল্লেখ্য, বিগত দিনে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বৃত্তের মানুষ হিসেবেই পরিচিত ছিলেন ইমন চক্রবর্তী। এমনকি চলতি বছরের হাইভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচনে শাসক শিবিরের হয়ে ইমনের টিকিট পাওয়ার জল্পনাও তুঙ্গে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ভোটে না দাঁড়ালেও, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থেকে রাজপথে কোমর বেঁধে প্রচার করতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে সরকারের ‘উন্নয়নের পাঁচালী’ গেয়ে গানও বেঁধেছিলেন ইমন। আর ঠিক এই কারণেই নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র কটাক্ষ ও ট্রোলিংয়ের শিকার হতে হয় গায়িকাকে।
বিগত দিনে ট্রোলিং এমন এক কুৎসিত পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ইমনের প্রয়াত মায়ের মৃত্যুদিনেও তাঁকে ‘চটিচাটা’ বলে কুরুচিকর আক্রমণ করতে ছাড়েনি নেটিজেনদের একাংশ। চরম মানসিক অবসাদে ভুগেই একসময় সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় বা ডিলিট করে দিয়েছিলেন গায়িকা। সেই সময় খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইমনকে সাহস জুগিয়েছিলেন এবং বার্তা দিয়েছিলেন যে, কিছু অসামাজিক মানুষের নোংরা মন্তব্যের জন্য যেন তিনি সোশ্যাল মিডিয়া ছেড়ে না যান। সেই নির্দেশ মেনেই ইমন আবার ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কামব্যাক করেছেন। বর্তমানে ব্যক্তিগত জীবনের নানা মজার মুহূর্ত ও নতুন গানের আপডেট শেয়ার করার পাশাপাশি, নতুন সরকারের জমানাতেও নির্ভীকভাবে নিজের অধিকারের কথা সোচ্চার করলেন গায়িকা। এখন দেখার, বঙ্গে ক্ষমতার এই পালাবদলে ইমনের মতো মুক্তমনা শিল্পীদের আর্জি নতুন শাসকদল কতটা মান্যতা দেয়।





