ভারতীয় রেল এবার এক ঐতিহাসিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। রেল মন্ত্রক ঘোষণা করেছে যে, ২০২৬ সালের আগস্ট মাস থেকে ট্রেনগুলিতে পর্যায়ক্রমে একটি নতুন এবং অত্যন্ত উন্নত ‘যাত্রী সংরক্ষণ ব্যবস্থা’ চালু করা হবে। এই পরিবর্তনটিকে রেলওয়ের প্রায় ৪০ বছরের পুরোনো টিকিট বুকিং ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে আধুনিকীকরণের দিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রেল ভবনে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে এই ডিজিটাল রূপান্তরের সময় সাধারণ যাত্রীদের কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে না হয়। বৈঠকে রেল প্রতিমন্ত্রী ভি. সোমন্না এবং রভনীত সিং বিট্টু উপস্থিত ছিলেন। রেলওয়ের এখন মূল লক্ষ্য হলো সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং অ্যাপ-ভিত্তিক পরিষেবা প্রদান করে যাত্রীদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করে তোলা।
৪০ বছরের প্রথা বিদেয়, এআই-এর যুগ শুরু
ভারতীয় রেলের বর্তমান রিজার্ভেশন সিস্টেমটি ১৯৮৬ সালে চালু হয়েছিল। দীর্ঘ চার দশকে এতে অনেক পরিবর্তন এলেও, এর পরিকাঠামো মূলত পুরোনো প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই চলছিল। নতুন এআই-ভিত্তিক (Artificial Intelligence) ব্যবস্থাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে, যা একযোগে লক্ষ লক্ষ যাত্রীর টিকিট বুকিং সামলাতে পারবে। ফলে ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ক্র্যাশ করার যে দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা ছিল, তার সমাধান হবে। বর্তমানে ভারতের মোট রেল টিকিটের ৮৮ শতাংশই ডিজিটাল মাধ্যমে বুক করা হয়, যা কাউন্টারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে।
‘রেলওয়ান’ (RailOne): রেলের নতুন সুপার অ্যাপ
রেলের ডিজিটাল মুখ হয়ে উঠেছে ‘রেলওয়ান’ মোবাইল অ্যাপটি। গত বছরের জুলাইয়ে লঞ্চ হওয়ার পর এটি ইতিমধ্যে ৩৫ মিলিয়নের বেশি ডাউনলোড হয়েছে। এই একটি অ্যাপেই যাত্রীরা অসংরক্ষিত টিকিট বুকিং থেকে শুরু করে ট্রেনের লাইভ স্ট্যাটাস দেখা, কোচের অবস্থান জানা, খাবারের অর্ডার দেওয়া এবং এমনকি অভিযোগ দায়ের করার মতো সব পরিষেবা পাবেন। বর্তমানে প্রতিদিন এই অ্যাপের মাধ্যমে প্রায় ৯.২৯ লক্ষ টিকিট বুক করা হচ্ছে।
৯৪% নিখুঁত ওয়েটলিস্ট প্রেডিকশন
RailOne অ্যাপের সবচেয়ে চমকপ্রদ ফিচার হলো এর এআই-ভিত্তিক ওয়েটলিস্ট পূর্বাভাস। আগে আপনার অপেক্ষমাণ টিকিটটি কনফার্ম হবে কি না, তার অনুমানের নির্ভুলতা ছিল মাত্র ৫৩ শতাংশ। কিন্তু নতুন প্রযুক্তিতে এটি ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে যাত্রীরা অনেক আগেই বুঝতে পারবেন তাদের টিকিটটি কনফার্ম হবে কি না এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারবেন।
যাত্রী ভাড়ায় বিশাল ভর্তুকি
প্রযুক্তির উন্নতির পাশাপাশি রেলওয়ে সামাজিক দায়বদ্ধতাও বজায় রাখছে। ২০২৪-২৫ সালে সরকার রেলযাত্রীদের ভাড়ায় মোট ৬০,২৩৯ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। অর্থাৎ, ১০০ টাকা খরচের বিপরীতে যাত্রীদের থেকে নেওয়া হচ্ছে মাত্র ৫৭ টাকা। বাকি ৪৩ শতাংশ খরচ বহন করছে সরকার নিজেই। রেলওয়ের এই নতুন প্রযুক্তি-নির্ভর স্মার্ট নেটওয়ার্ক সাধারণ মানুষের ভ্রমণকে আরও গতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য করে তুলবে বলেই আশা করা হচ্ছে।





