বাংলার রাজনীতিতে শেষ কথা বলে ‘জেদ’ আর ‘টাইমিং’। আর এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই আজ নবান্নের সিংহাসনে আসীন হলেন মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রামের সেই রক্তাক্ত মাটি থেকে নবান্নের ১৪ তলা— শুভেন্দুর এই যাত্রা কোনো রোমাঞ্চকর উপন্যাসের চেয়ে কম নয়। একসময়ের তৃণমূলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড কীভাবে আজ বিজেপির হাত ধরে বাংলার প্রথম গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী হলেন, ফিরে দেখা যাক সেই রোমহর্ষক টার্নিং পয়েন্টগুলো।
১. নন্দীগ্রামের সেই ঐতিহাসিক ‘পদ্ম’ জয় শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক জীবনের সবথেকে বড় মোড় ছিল ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন। খোদ দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের জেলায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছিলেন শুভেন্দু। ১৯৫৬ ভোটে সেই জয় কেবল একটি আসন জয় ছিল না, বরং তা ছিল শুভেন্দুর রাজনৈতিক অস্তিত্বের লড়াই। সেই জয়ই তাঁকে দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘গুড বুক’-এ তুলে আনে এবং তাঁকে বাংলার বিকল্প মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
২. বিদ্রোহী সুর ও মেদিনীপুরের আবেগ তৃণমূলের অন্দরে যখন কোণঠাসা হচ্ছিলেন, তখন শুভেন্দু বেছে নিয়েছিলেন অরাজনৈতিক মঞ্চকে। ভারতমাতা এবং মেদিনীপুরের বীর সন্তানদের স্মরণ করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর লড়াই শুধু দলের বিরুদ্ধে নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার। মেদিনীপুরের ঘরে ঘরে নিজেকে ‘ভূমিপুত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছিল তাঁর অন্যতম সেরা কৌশল, যা আজ তাঁকে সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিল।
৩. শাহের চাণক্য নীতি ও শুভেন্দুর আনুগত্য অমিত শাহের হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই শুভেন্দু ছিলেন দিল্লির সবথেকে বিশ্বস্ত সেনাপতি। শাহের দেওয়া প্রতিটি দায়িত্ব তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে পালন করেছেন। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ এবং জঙ্গলমহলে ঝোড়ো প্রচার চালিয়ে যেভাবে তিনি বিজেপিকে জয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন, তারই প্রতিদান হিসেবে আজ তাঁর মাথায় উঠল বাংলার মুকুট।
৪. ‘ভবানীপুর জয়’— শেষ পেরেক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজের দুর্গ ভবানীপুরে পরাজিত করা ছিল শুভেন্দুর রাজনীতির ‘মাস্টারস্ট্রোক’। যে নেত্রীর আঙুল ধরে একসময় রাজনীতিতে উত্থান, সেই নেত্রীকেই তাঁর খাসতালুকে হারানো শুভেন্দুর ব্যক্তিত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। এই জয়ই চূড়ান্ত করে দিয়েছিল যে, বাংলার পরবর্তী প্রশাসনিক প্রধান হওয়ার সবথেকে যোগ্য দাবিদার তিনিই।
৫. সাংগঠনিক দক্ষতা ও নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সংযোগ শুভেন্দুর সবথেকে বড় শক্তি হলো তাঁর নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ। রাত-বিরেতে কর্মীর বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া বা বুথ স্তরের কর্মীদের নাম ধরে ডাকা— এই গুণই তাঁকে জননেতা করে তুলেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বাইরে বেরিয়ে মাটির মানুষের সঙ্গে তাঁর এই সংযোগই আজ নবান্নের পথ প্রশস্ত করল।
বাংলার ইতিহাসে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। শুভেন্দু অধিকারীর এই উত্তরণ যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনই রাজনৈতিক কৌশলের এক বড় পাঠ। এখন দেখার, নন্দীগ্রামের সেই লড়াকু মেজাজ তিনি নবান্নের প্রশাসনিক কাজে কতটা বজায় রাখেন। ডেইলিয়ান্ট-এর পাঠকদের জন্য শুভেন্দু-যুগের প্রতি মুহূর্তের আপডেট থাকবে আমাদের নজরে।





