রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে খুনের ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠল রাজ্য রাজনীতি। বুধবার রাতের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে ইতিমধ্যেই বড়সড় সাফল্যের দাবি করেছে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করা হয়েছে। যদিও তদন্তের স্বার্থে এখনই ধৃতদের নাম-পরিচয় খোলসা করতে নারাজ লালবাজারের দুঁদে আধিকারিকরা।
নিখুঁত ছক ও অপারেশন দোহাসিয়া:
বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোলতলা সংলগ্ন দোহারিয়া এলাকায় যখন হামলার ঘটনাটি ঘটে, তখন চারপাশ ছিল নিস্তব্ধ। পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের খবর, চারটি মোটরবাইকে মোট আটজন সশস্ত্র দুষ্কৃতী চন্দ্রনাথবাবুর গাড়ির পিছু নিয়েছিল। দোহারিয়ার একটি বাইপাস রোডে পৌঁছতেই ফিল্মি কায়দায় একটি ছোট চারচাকা গাড়ি আচমকা চন্দ্রনাথের গাড়ির সামনে ব্রেক কষে রাস্তা আটকে দেয়। সঙ্গে সঙ্গেই আটজন বাইক আরোহী গাড়িটিকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে এলোপাথাড়ি গুলিবৃষ্টি শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁঝরা হয়ে যায় চন্দ্রনাথের গাড়ি। গুলিতে গুরুতর জখম হন চন্দ্রনাথ ও তাঁর সঙ্গী বুদ্ধদেব বেরা। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা চন্দ্রনাথকে মৃত ঘোষণা করেন। বুদ্ধদেব বেরার অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে কলকাতার একটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।
তদন্তে সিট ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ:
এই হাই-প্রোফাইল খুনের রহস্য উদঘাটনে ইতিমধ্যেই বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (SIT) গঠন করেছে রাজ্য পুলিশ। বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল। যে গাড়িটিতে হামলা হয়েছিল, সেই গাড়িটির দরজা, কাচ এবং সিট থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গুলির গতিপথ এবং হামলাকারীরা ঠিক কত দূর থেকে গুলি চালিয়েছিল, তা বোঝার চেষ্টা করছেন বিশেষজ্ঞরা। উদ্ধার হওয়া কার্তুজের খোল পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে গোয়েন্দাদের অনুমান, এই হামলাটি অত্যন্ত পেশাদার খুনিদের দ্বারা সংঘটিত এবং এর পিছনে দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল।
সিসিটিভি ও মোবাইল টাওয়ার লোকেশন:
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে হামলাকারীরা কীভাবে অনুসরণ করেছিল, তা জানতে এলাকার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আটক তিন ব্যক্তির মোবাইল টাওয়ার লোকেশন এবং কল লিস্ট পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে ঘটনার সময় তারা কোথায় ছিল এবং কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল। রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্ত নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন এবং জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীদের ফেলে যাওয়া একটি চারচাকা গাড়ি ইতিমধ্যেই পুলিশের কব্জায়।
উত্তপ্ত রাজনৈতিক আবহ:
ভোট-পরবর্তী বাংলায় বিরোধী দলনেতার আপ্তসহায়ক খুনের ঘটনায় স্বভাবতই রাজ্য প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। চন্দ্রনাথের আবাসন সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। বারাসত মেডিক্যাল কলেজে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে এলেই এই হত্যাকাণ্ডের আরও গভীর রহস্য উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।





