বাংলার রাজনীতি একসময় পরিচিত ছিল রাজপথের লড়াই আর ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতাদের জন্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য—সবাই লড়েছেন শূন্য থেকে। কিন্তু ছাব্বিশের নির্বাচনে সেই ট্র্যাডিশন যেন ফিকে হয়ে আসছে। এবার ঘাসফুল থেকে গেরুয়া, হাত শিবির থেকে লাল দুর্গ—সব দলই মেতেছে ‘পরিবারতন্ত্র’-এর খেলায়। নির্বাচনী ময়দানে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন নেতাদের পুত্র, কন্যা, ভাই বা স্ত্রীরা।
তৃণমূল কংগ্রেস: পরিবারতন্ত্রের ‘হেভিওয়েট’ তালিকা
শাসক দলের প্রার্থী তালিকায় পারিবারিক সংযোগের ছড়াছড়ি সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
ঘটক পরিবার: আসানসোল উত্তরে মলয় ঘটক, আর তাঁর ভাই অভিজিৎ ঘটক লড়ছেন কুলটি থেকে।
বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার: চারবারের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলে শির্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থী হয়েছেন উত্তরপাড়ায়।
চট্টোপাধ্যায়-দাস পরিবার: রত্না চট্টোপাধ্যায় (বেহালা পশ্চিম) এবং তাঁর ভাই শুভাশীস দাস (মহেশতলা) লড়ছেন একই দফার নির্বাচনে।
পাণ্ডে পরিবার: মানিকতলায় মা সুপ্তি পাণ্ডের উত্তরসূরি হিসেবে লড়ছেন মেয়ে শ্রেয়া পাণ্ডে।
ঘোষ পরিবার: প্রাক্তন বিধায়ক নির্মল ঘোষের পুত্র তীর্থঙ্কর ঘোষ লড়ছেন পানিহাটি থেকে।
বিজেপি: ‘পরিবারতন্ত্র’ নিয়ে আক্রমণ করেও ঘরের ছেলে যখন প্রার্থী
বিজেপি বারবার তৃণমূলকে পরিবারতন্ত্র নিয়ে আক্রমণ করলেও, তাদের তালিকায় স্বজনপোষণের উদাহরণ কম নেই:
অধিকারী পরিবার: নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী এবং এগরায় তাঁর ভাই দিব্যেন্দু অধিকারী।
ঠাকুর পরিবার (মতুয়া গড়): গাইঘাটায় সুব্রত ঠাকুর (শান্তনু ঠাকুরের ভাই) এবং বাগদায় শান্তনুর স্ত্রী সোমা ঠাকুর। মজার বিষয় হলো, সোমার বিরুদ্ধে তৃণমূলের টিকিটে লড়ছেন তাঁর ননদ মধুপর্ণা ঠাকুর।
সিং পরিবার: ভাটপাড়ায় অর্জুন সিং-এর ছেলে পবন সিং, আর নোয়াপাড়ায় লড়ছেন খোদ অর্জুন সিং।
সিকদার পরিবার: প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তপন সিকদারের ভাগ্নে সৌরভ সিকদার লড়ছেন উত্তর দমদম থেকে।
বাম ও কংগ্রেস: পিছিয়ে নেই ওল্ড স্কুল দলগুলোও
একসময় যারা পরিবারতন্ত্রের তীব্র বিরোধী ছিল, সেই বামেরাও এবার ‘নেতা-পুত্র’ তত্ত্বে ভরসা রেখেছে:
সিপিআই(এম): প্রাক্তন মন্ত্রী গৌতম দেবের পুত্র সপ্তর্ষি দেব (রাজারহাট নিউ টাউন) এবং পদ্মা নিধি ধরের নাতনি দীপ্তিতা ধর (দমদম উত্তর)।
বসুন্ধরা গোস্বামী: প্রাক্তন আরএসপি মন্ত্রী ক্ষিতি গোস্বামীর কন্যা প্রার্থী হয়েছেন পূর্বস্থলী উত্তর থেকে।
কংগ্রেস: সোমেন মিত্রের পুত্র রোহন মিত্র (বালিগঞ্জ), গনি খান চৌধুরীর ভাইঝি মৌসম নূর (মালতিপুর) এবং নেপাল চন্দ্র মাহাতো (বাঘমুন্ডি)। আলী ইমরান রামজ লড়ছেন চাকুলিয়া থেকে।
বদলে যাচ্ছে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি?
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় আদর্শের লড়াই প্রাধান্য পেলেও এখন জেতার হারের (Winnability) তাগিদে প্রতিষ্ঠিত পরিবারের ওপরেই ভরসা রাখছে দলগুলি। এর ফলে যেমন নতুন মুখ উঠে আসার পথ রুদ্ধ হচ্ছে, তেমনই দলের অনুগত কর্মীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। সাধারণ ভোটাররা এই ‘পরিবারতন্ত্র’কে আশীর্বাদ না কি অভিশাপ হিসেবে গ্রহণ করবেন, তা জানা যাবে ৪ মে।





