পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘মুসলিম ভোট’ সবসময়ই আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য ঘিরে বিরোধীরা ‘তোষণ রাজনীতি’র অভিযোগ তুললেও, তৃণমূল কংগ্রেস যে নিজেদের অবস্থানে অনড়, তা স্পষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের ২৭ শতাংশ মুসলিম ভোটকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত করেছেন, যা ভাঙা বিজেপি বা বাম-কংগ্রেসের পক্ষে হিমালয় জয়ের মতোই কঠিন।
বাম শাসন থেকে মমতার ডেরায়: যেভাবে বদলে গেল ইতিহাস
২০১১ সালের আগে বাংলার মুসলিম ভোট মূলত বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মধ্যে ভাগ হতো। মমতা সেই সমীকরণ বদলে দেন ‘সাচার কমিটি’র রিপোর্টকে হাতিয়ার করে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনে মুসলিম কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে এই সম্প্রদায়ের ‘রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। ফলস্বরূপ, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই ভোটব্যাঙ্ক তৃণমূলের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
তৃণমূলের জয়ের ফর্মুলা: ৭৫ + ৭৫ = ১৪৮
২৯৪ আসনের বিধানসভায় ম্যাজিক ফিগার ১৪৮। মমতার নির্বাচনী অংকটি অত্যন্ত সরল কিন্তু অব্যর্থ:
-
নিশ্চিত ৭৫: রাজ্যে এমন প্রায় ৭৫টি আসন রয়েছে যেখানে মুসলিম ভোটাররা নির্ণায়ক শক্তি। ২০২১ সালে এর মধ্যে অধিকাংশ আসনেই জিতেছে তৃণমূল।
-
লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ও নারী শক্তি: বাকি ৭৫টি আসনের জন্য মমতার ভরসা ‘কন্যাশ্রী’, ‘ঐক্যশ্রী’ এবং ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর মতো সামাজিক প্রকল্প। নারী ভোটার ও মুসলিম ভোটের সংমিশ্রণে জয়ের পথ প্রশস্ত করাই তৃণমূলের স্ট্র্যাটেজি।
ইমাম ভাতা থেকে ৫৭১৩ কোটির বাজেট: শুধুই কি প্রতীকী?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় ওড়না দেওয়া বা ইফতার পার্টিতে যোগ দেওয়াকে বিজেপি ‘তোষণ’ বললেও, তৃণমূলের দাবি এটি একটি সম্প্রদায়কে প্রাপ্য সম্মান জানানো। তবে শুধু প্রতীকী নয়, তৃণমূল সরকার মাটির স্তরেও কাজ করেছে। ২০২৬-এর আগে সংখ্যালঘু উন্নয়ন খাতে ৫৭১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ইমাম ভাতা থেকে শুরু করে মাদ্রাসার আধুনিকীকরণ— এই পদক্ষেপগুলো মুসলিম সমাজের মধ্যে একটি অনুগত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তৈরি করেছে।
বিজেপি ভীতি ও অস্তিত্বের লড়াই
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজ্যে বিজেপির উত্থান পরোক্ষভাবে মমতাকেই সুবিধা করে দিয়েছে। বিজেপি যখন NRC বা CAA-এর মতো ইস্যু সামনে আনে, তখন মুসলিম ভোটারদের কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া আর কোনো ‘ঢাল’ বা বিকল্প থাকে না। ২০২১-এর নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে, মালদহ-মুর্শিদাবাদের মতো কংগ্রেসের পুরনো দুর্গগুলোতেও মুসলিম ভোটাররা সর্বশক্তি দিয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন যাতে বিজেপিকে রোখা যায়।
বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ
কংগ্রেস ও বামপন্থীরা বারবার তৃণমূলের এই সমীকরণ ভাঙার চেষ্টা করলেও, নেতৃত্বে অভাব এবং সঠিক কৌশলের অভাবে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির ISF বা ওয়াইসির মিম (AIMIM) কিছুটা প্রভাব ফেলার চেষ্টা করলেও, বড় কোনো ধাক্কা দিতে পারেনি। ফলে ২০২৬-এর মহারণে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ‘মুসলিম প্রাচীর’ পার করা বিরোধীদের জন্য এখন সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।