সময়ের চাকা ঘুরলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি শব্দ আজও অবিচল, তা হলো ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’। এবারের অন্তর্বর্তী বাজেটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকল্পে আরও ৫০০ টাকা বৃদ্ধির ঘোষণা বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে দিল। ভোটের আগে মা-বোনেদের মন জয়ে মমতা যখন অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটিয়েছেন, ঠিক তখনই ময়দানে নেমে বড় ঘোষণা করলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই অঙ্ক ৩০০০ টাকায় নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লড়াইকে আরও হাড্ডাহাড্ডি করে তুলেছেন তিনি।
মহিলা ভোটব্যাঙ্ক ও মমতার জাদুর কাঠি: পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গে মহিলা ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭৬ লক্ষ। আর এই ‘মৌন ভোটার’রাই যে তৃণমূলের প্রধান শক্তি, তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। ২০১৯-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতের একমাত্র দল তৃণমূল কংগ্রেস, যারা পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের ভোট বেশি পায়। ২০১৬-তে ৫২% মহিলা ভোটার ঘাসফুল শিবিরে আস্থা রেখেছিলেন। ২০১৩-র ‘কন্যাশ্রী’ থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা ২০২১-এর ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’ এসে এক অজেয় দুর্গে পরিণত হয়েছে। সমালোচকরা একে ‘ভাতার রাজনীতি’ বললেও, ভোটের ফলে স্পষ্ট যে, ধর্ম বা দুর্নীতির ইস্যুর চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে মহিলাদের পকেটে সরাসরি পৌঁছানো এই টাকা বড় ‘চলরাশি’ হিসেবে কাজ করেছে।
২০২৬-এর লক্ষ্যমাত্রা ও টাকার অঙ্ক: ২০২১-এ যাত্রা শুরু হয়েছিল ৫০০ টাকা দিয়ে। ২০২৪-এর লোকসভার আগে তা ১০০০ হয়। এবার ২০২৬-এর বিধানসভাকে পাখির চোখ করে রাজ্য সরকার বাজেটে ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ করেছে। ফলে সাধারণ শ্রেণির মহিলারা এখন থেকে পাবেন ১৫০০ টাকা এবং তফশিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত মহিলারা পাবেন ১৭০০ টাকা। এই মাস থেকেই বর্ধিত টাকা সরাসরি ঢুকবে অ্যাকাউন্টে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্রর মতে, বাংলার রাজনীতি এখন ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’ এবং ‘অনুদান’—এই দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে। বিজেপি যেখানে অনুপ্রবেশ বা ধর্মীয় মেরুকরণকে হাতিয়ার করতে চাইছে, সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ দিয়ে সেই বিভেদরেখা মুছে ফেলার চেষ্টা করছেন। এই ‘মৌন ভোটার’রাই কি তবে ২০২৬-এর ভাগ্যবিধাতা হতে চলেছেন? লড়াই এখন ৫০০ বনাম ৩০০০-এর!