আনন্দপুরের নাজিরাবাদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের আজ আট দিন পার। আগুনের লেলিহান শিখা নিভে গেলেও স্বজনহারাদের চোখের জল এখনও শুকোয়নি। বিশেষ করে পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার দুই পরিবার এখনও এই আশায় প্রহর গুনছে যে, ঘরের ছেলে হয়তো একদিন ঠিক দরজায় কড়া নাড়বে। কিন্তু বাস্তবের রূঢ় পরিস্থিতি বলছে অন্য কথা। এখনও পর্যন্ত আনন্দপুরের এই বিধ্বংসী কাণ্ডে মোট ২৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ২৭ জন।
অপেক্ষার প্রহর আর শেষ হয় না: ময়নার বাসিন্দা বুদ্ধদেব জানা এবং সৌমিত্র মণ্ডল ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জক। দুর্ঘটনার ঠিক কিছুক্ষণ আগেই বুদ্ধদেব বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছিলেন যে তিনি সোমবার বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু সেই সোমবার আর আসেনি। সৌমিত্রর স্ত্রী আজও হাতে শাঁখা-পলা এবং সিঁথিতে সিঁদুর পরে পথ চেয়ে বসে আছেন। তাঁর বিশ্বাস, স্বামী ফিরে আসবেনই। যদিও ইতিমধ্যেই ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার নমুনা দিয়ে এসেছেন পরিবারের সদস্যরা, তবুও অলৌকিক কিছুর অপেক্ষায় দিন কাটছে তাঁদের। সোমবার স্থানীয় বিজেপি নেতা চন্দন মণ্ডল এই দুই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যক্তিগত উপার্জন থেকে ৫০ হাজার টাকার অর্থসাহায্য তুলে দেন।
অগ্নিসুরক্ষা বিধিকে বুড়ো আঙুল: তদন্তে নামতেই একের পর এক হাড়হিম করা তথ্য সামনে আসছে। নরেন্দ্রপুর থানার পুলিশ ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। নিউ পুষ্পাঞ্জলী নার্সারি প্রাইভেট লিমিটেডের মালিক গঙ্গাধর দাসের পর এবার পুলিশের জালে ‘Wow Momo’-র ম্যানেজার রাজা চক্রবর্তী এবং ডেপুটি ম্যানেজার মনোরঞ্জন শিট। অভিযোগ উঠেছে, যে গোডাউনটিতে আগুন লেগেছিল, সেখানে অগ্নিনির্বাপক কোনও যন্ত্রই ছিল না। অর্থাৎ, স্রেফ মুনাফার জন্য কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করানো হচ্ছিল। দমকল আধিকারিকদের দাবি, গোডাউনে অগ্নিসুরক্ষার ন্যূনতম বিধিও মানা হয়নি।
২৫ মৃত্যু, ২৭ নিখোঁজ— ভয়াবহ পরিসংখ্যান: আনন্দপুরের এই গোডাউনটি ছিল মূলত ঘিঞ্জি এলাকার একটি মৃত্যুকূপ। সেখান থেকে এখনও পর্যন্ত দুই কর্মী এবং এক নিরাপত্তারক্ষীর দেহ উদ্ধার হয়েছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ২৭ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি হয়েছে। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা দুর্ঘটনাস্থল থেকে এখনও দেহাংশ উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছেন। মৃতদেহের অবস্থা এতটাই বিভৎস যে ডিএনএ টেস্ট ছাড়া শনাক্তকরণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিলেও, নিখোঁজদের পরিবার চাইছে কেবল তাঁদের প্রিয়জনকে একবার শেষবারের মতো দেখতে।
আনন্দপুরের এই ক্ষত হয়তো শুকিয়ে যাবে, কিন্তু ময়নার ওই পরিবারগুলোর কাছে ‘আনন্দ’ শব্দটা চিরকালের জন্য এক বিভীষিকা হয়ে রয়ে গেল।