গত কয়েক মাসে ডলারের তুলনায় ভারতীয় টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা ১ ডলার প্রতি ৯০ টাকার গণ্ডিও ছাড়িয়ে গিয়েছে। গোটা বিশ্বের অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হচ্ছে, তখন টাকার এই পতন দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের মনে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের জন্য বাহ্যিক চাপ এবং অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে দায়ী করেছেন।
টাকার এই মূল্যপতনের ৫টি প্রধান কারণ নিচে আলোচনা করা হলো:
১. আমদানি নির্ভরতা ও ডলারের তীব্র চাহিদা:
ভারত অপরিশোধিত তেল, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং সোনার মতো পণ্য কেনার জন্য বিপুল পরিমাণ ডলার খরচ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে ভারতের ডলারের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ে। বেশি টাকা দিয়ে ডলার কিনতে হওয়ায় ভারতীয় টাকার মূল্য সরাসরি কমে যায়। অর্থাৎ, টাকার মূল্য অনেকাংশে বৈশ্বিক বাজারের ওঠানামার উপর নির্ভরশীল।
২. লাগামহীন বাণিজ্য ঘাটতি:
টাকার পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাণিজ্য ঘাটতি (Trade Deficit)। যখন দেশের আমদানির পরিমাণ রফতানির চেয়ে বেশি হয়, তখন দেশে ডলারের খরচ বাড়ে কিন্তু উপার্জন কমে। অর্থনীতিবিদ সুপর্ণ পাঠক বলছেন, সফটওয়্যার ও পরিষেবা রফতানি বাড়লেও পণ্য রফতানি সেই অনুপাতে না বাড়ায় এই ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যা টাকার উপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করছে।
৩. বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাহার:
ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, বিশ্বমন্দার ভয় বা আমেরিকায় সুদের হার বৃদ্ধির মতো অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিলে ফরেন পোর্টফোলিও ইনভেস্টররা (FPI) দ্রুত ভারতীয় শেয়ার ও বন্ড বাজার থেকে টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। তারা ভারতীয় টাকাকে ডলারে রূপান্তর করে টাকা বের করে নিলে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায় এবং টাকার দাম কমে যায়। সুপর্ণ পাঠক জানান, “টাকার দাম পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, তাদের বিনিয়োগ ধরে রাখলে ক্ষতি হবে।”
৪. বিশ্বজুড়ে ডলারের শক্তিশালী হওয়া:
মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সম্প্রতি একাধিকবার রেট কাট (সুদের হার কমানো) করেছে। এর ফলে আমেরিকায় কম সুদে ঋণ পাওয়া যায় এবং বিনিয়োগ বাড়ে। ফিক্সড ডিপোজিট ও বন্ডের রিটার্ন কমলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা মার্কিন বাজারে টাকা ঢালছেন, যা ডলারকে বিশ্বজুড়ে আরও শক্তিশালী করে তুলছে এবং অন্যান্য দেশের মুদ্রার দাম কমিয়ে দিচ্ছে।
৫. সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব:
টাকার মূল্য কমলে আমদানি করা সমস্ত পণ্যের দাম বেড়ে যায়। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, খাদ্য ও পরিবহণের খরচও বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও বিদেশে পড়াশোনা, বিদেশ ভ্রমণ ও আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধের খরচ সাধারণ মানুষের জন্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, রফতানিকারক ও প্রবাসীরা লাভবান হন।
নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ: অর্থনীতিবিদ সুপর্ণ পাঠক দেশের নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “আগে এমন পরিস্থিতিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক হস্তক্ষেপ করত। প্রয়োজনে ডলার কিনতো বা বিক্রি করত। এটাকে বলা হয় স্টেবিলাইজেশন গেম। আর সেটাই এখনও করছে না রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।” যদিও দীর্ঘমেয়াদে রফতানি বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখাই এই সংকট মোকাবিলার একমাত্র পথ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।