নীলকুঠি না ভুতুড়ে বাড়ি? বাঁকুড়ার সোনামুখীতে আজও দাঁড়িয়ে ব্রিটিশ ডাক্তার ও ব্যবসায়ী চিক সাহেবের প্রাচীন বাড়ি

বাঁকুড়ার সোনামুখী শহরে প্রবেশ করার পরই বাঁ দিকে তাকালে দেখা যায় একটি প্রাচীন, জীর্ণ বাড়ি—যা স্থানীয়দের মধ্যে ‘হানাবাড়ি’, ‘নীলকুঠি’ অথবা ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ নামে পরিচিত। তবে এই বাড়িটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তৎকালীন সোনামুখী বাণিজ্যনগরীর এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। এটি ছিল একজন ব্রিটিশ ডাক্তারের বাসস্থান ও ব্যবসার কেন্দ্র, যিনি পেশায় ডাক্তার হলেও, মনে প্রাণে ছিলেন একজন ধুরন্ধর ব্যবসায়ী।

ডাক্তার থেকে ব্যবসায়ী:

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসক হয়ে বাঁকুড়া, বর্ধমান এবং সোনামুখী অঞ্চল সামলাতেন ডক্টর জে এন চিক, যিনি ‘চিক সাহেব’ বা অপভ্রংশ করে ‘চিফ সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। ডাক্তার হিসেবে এলেও, তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন সোনামুখী এলাকায় রেশম, গালা এবং অত্যন্ত লাভজনক নীল চাষের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সময় থেকেই এই কুঠিতে শুরু হয় নীল চাষ-সহ অন্যান্য ব্যবসার কারবার।

প্রশাসক থেকে মুনাফাখোর:

স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, চিক সাহেব ছিলেন যথেষ্ট ধুরন্ধর। সোনামুখীকে প্রধান নিশানা করে তিনি তুমুল ব্যবসা শুরু করেন এবং প্রচুর মুনাফা লাভ করেন। তিনি রেশম, গালা এবং নীল—এই তিনটি লাভজনক ব্যবসায় হাত দেন। ব্যবসার বিরাট লাভের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে তাঁর এই বিরাট বাড়ি এবং তাঁর ব্যবসায়িক প্রসার। বাঁকুড়া শহরেও তাঁর একটি কুঠি ছিল।

চিক সাহেব একজন প্রশাসক হিসেবে এসে প্রথমে সোনামুখীর বয়ন শিল্পে হাত জমান, এরপর গালা ব্যবসায় এবং সবশেষে চাষিদের ওপর থাবা বসান নীল চাষের মাধ্যমে। তাঁর ব্যবসার প্রসার এতটাই বেড়েছিল যে পরে তিনি তাঁর পুরো বিজনেস মডেলটি ইলামবাজারেও সরিয়ে নিয়ে যান।

ইতিহাসের নীরব সাক্ষী:

ইতিহাসবিদদের মতে, চিক সাহেবের অত্যাচারী হওয়ার কথা খুব একটা জানা যায়নি। বরং এই ধুরন্ধর সাহেব শুধুই বুঝতেন কী ভাবে ব্যবসায় মুনাফা করতে হয়। সেই কারণে একজন ডাক্তার হয়েও বাঁকুড়ার সোনামুখীর মাটি থেকে সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করে তিনি প্রচুর মুনাফা করেছিলেন। তৎকালীন সময়ের এই প্রশাসক ডাক্তারের কথা আজ অনেকের কাছেই অজানা। আজও সেই প্রাচীন বাড়িটি সোনামুখীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে, যা একসময়ের সমৃদ্ধ বাণিজ্য এবং ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।