দু’চোখে কিছুই দেখতে পান না। তবুও টানা ১৫ বছর ধরে অনায়াসে সাইকেল, রিক্সা এবং ভ্যানের চাকা সারিয়ে চলেছেন নদিয়ার শান্তিপুর থানার বাথানগাছির বাসিন্দা ৬৮ বছর বয়সী কৃষ্ণধন সরকার। তাঁর হাতের ছোঁয়াতেই যেন প্রাণ ফিরে পায় বহু পুরনো দুই ও তিন চাকার গাড়ি। এলাকাবাসীর কাছে তিনি যেন স্বয়ং ‘বিশ্বকর্মার অবতার’।
প্রায় ৫০ বছর ধরে সাইকেল সারানোর কাজ করছেন কৃষ্ণধনবাবু। কিন্তু ১৫ বছর আগে তাঁর জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। চোখের জ্যোতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় যখন পুরো পরিবার অসহায়, তখন বাঁচার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে তাঁর সাইকেলের ছোট দোকানটি।
দৃষ্টিহীন অবস্থাতেই নিজের বাড়িতে তিনি ফের কাজ শুরু করেন। প্রথমদিকে সমস্যা হলেও, এত বছরের অভিজ্ঞতা আর দক্ষতা এক্ষেত্রে সহায় হয় তাঁর। এখন তিনি না-দেখেও শুধু অনুভবের মাধ্যমে, হাতের আন্দাজে চাকার প্রতিটি সমস্যার সমাধান করে ফেলেন নিমিষেই। এই জাদুকরী দক্ষতার কারণেই সাইকেল থেকে শুরু করে ভ্যানের সমস্যায় এলাকার মানুষ এখনও তাঁর দোকানেই ভিড় জমান।
প্রতিবেশী সুধীর দেবনাথ সাইকেল সারাতে এসে জানান, “আমরা ছোট থেকেই কৃষ্ণধনকে সাইকেল সারাতে দেখছি। চোখে না-দেখলেও উনি নির্ভুলভাবে কাজ করেন, টাকাও নিজেই নেন। ওঁর হাতে কোনও অসুবিধা হয় না।”
অন্যদিকে, কৃষ্ণধনের স্ত্রী সবিতা সরকারও চোখে ভালো করে দেখতে পান না। একমাত্র ছেলে সৌমিত্র সরকার টোটো চালিয়ে সামান্য রোজগার করেন। বর্তমানে কৃষ্ণধন সরকার মাসিক ১,০০০ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা পান। সরকারি সহায়তা এবং দোকানের এই সামান্য রোজগারে কোনো রকমে চলে তাঁদের সংসার।
কৃষ্ণধন সরকার বলেন, “শারীরিক কারণে আমার চোখের জ্যোতি দিন দিন কমতে থাকে। যাতায়াতের অসুবিধার কারণেই বাড়িতে দোকান করি। এখন সবটাই অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমি চাই, সংসারের স্বার্থে সরকার যদি কিছু বাড়তি সাহায্য করে, তাহলে সুবিধা হয়।”
বার্ধক্য বয়সে এসেও জীবনের কঠিন যুদ্ধে হার না মানা কৃষ্ণধন সরকারের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন প্রতিবেশীরাও। যদিও শান্তিপুর ব্লক উন্নয়ন আধিকারিক সঞ্জীব সরকার পরিবারটিকে মানবিক দিক থেকে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন।