দুর্ভিক্ষে গ্রামবাসীদের অন্ন-বস্ত্র জোগাতে ডাকাতি, ব্রিটিশ পুলিশের হাত থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়ে পুজো শুরু ‘এই’ কালীর

মা কালীর পুজো মানেই নানা ইতিহাস আর লোককথা। নদীয়ার মাজদিয়ার ঘোষপাড়া ডাকাতে কালীতলায় যে কালী পুজো হয়, তার নেপথ্যে রয়েছে এক শিউরে ওঠার মতো কাহিনি। এটি কোনো সাধারণ ডাকাতদল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পুজো নয়, বরং গ্রামবাসীর জন্য খাদ্য-বস্ত্র জোগাড় করতে ডাকাতি করে আসা একদল যুবকের ১১২ বছরের পুরনো বিশ্বাস আর ঐতিহ্যের প্রতীক।

স্থানীয়দের কাছে এই কালী ‘ডাকাতে কালী’ নামে পরিচিত এবং এটি খুবই জাগ্রত বলে বিশ্বাস করা হয়।

যে কারণে ডাকাতি
স্থানীয় শিক্ষক সুকুমার ঘোষের কাছ থেকে জানা যায়, আজ থেকে প্রায় ১১২ বছর আগে ওই গ্রামে চরম অভাব-অনটন চলছিল। দু’বেলা দু’মুঠো খাবার পাচ্ছিলেন না অনেকে। সেই করুণ অবস্থা দেখে ব্যথিত হয়ে গ্রামের কয়েকজন যুবক ডাকাতি করার সিদ্ধান্ত নেন— তবে নিজেদের জন্য নয়, গ্রামের মানুষের জন্য খাবার যোগাড় করতে।

তখন চলছে কড়া ব্রিটিশ শাসন। যুবকেরা খবর পান যে, বাংলাদেশের ঢাকার দিকে যাচ্ছে ব্রিটিশদের মালবাহী একটি ট্রেন। এই ট্রেনেই ডাকাতি করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।

ট্রেন ডাকাতি ও অলৌকিক রক্ষা
যুবকেরা রাতের অন্ধকারে হাতে লন্ঠনের লাল আলো দেখিয়ে কৌশলে একটি ব্রিজের ওপর ট্রেনটিকে দাঁড় করিয়ে দেন। এরপর ট্রেনের বগি থেকে কাপড়ের বান্ডিল এবং খাদ্যসামগ্রী লুট করে দ্রুত নদীর জলে ফেলে দেওয়া হয়। ডাকাতেরা সরে যাওয়ার পর ট্রেনটি আবার চলতে শুরু করে।

কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই খবর পৌঁছে গিয়েছিল ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে। শুরু হয়ে গেল জোর তল্লাশি। ডাকাত দলের সদস্যরা জঙ্গলে আশ্রয় নিলেও ব্রিটিশ পুলিশ নদীতে ফেলা কাপড়ের বান্ডিলের হদিশ পায়নি। পরে সেই কাপড় ও লুট করা খাদ্য সামগ্রী তাঁরা গ্রামের মানুষের মধ্যে বিলি করেন।

ব্রিটিশ বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে জঙ্গলেই কাটছিল তাঁদের দিন। সেই চরম সংকটের মুহূর্তে তাঁরা মা কালীকে স্মরণ করে মানত করেন— “মা তুমি বাঁচিয়ে দাও, আমরা তোমার পুজো দেব।” অলৌকিকভাবেই সেদিন ব্রিটিশ পুলিশ তাদের সন্ধান পায়নি এবং ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

পুজোর সূচনা
ব্রিটিশ বাহিনী ফিরে যাওয়ার পরদিনই ছিল অমাবস্যার কালীপুজো। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ডাকাতরা একটি বেল ও নিম গাছের পাশেই বেদি বানিয়ে মা কালীর পুজোর আয়োজন করেন। সেই থেকে শুরু হয় এই ‘ডাকাতে কালীর’ আরাধনা।

বহু বছর পেরিয়ে গেলেও এই পুজো আজও নিষ্ঠা সহকারে পালিত হয়। শোভাযাত্রায় হাজার হাজার পুরুষ, মহিলা পা মেলান। বলা যেতে পারে, নদীয়ার মাজদিয়ার মানুষের কাছে এই ডাকাতে কালী এখন শুধু পুজো নয়, এক গভীর আবেগ আর ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।