শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই নয়, আজকাল শিশু-কিশোরদের মধ্যেও অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে ওবেসিটি বা স্থূলতার সমস্যা। এর প্রধান কারণ হিসেবে ধরা যায় লোভনীয় ফাস্ট ফুডের সহজলভ্যতা। অধিকাংশ পরিবারে একটি বা দুটি সন্তান থাকার কারণে এবং তারা আদরের হওয়ায়, চিপস, পেস্ট্রি, চকোলেটের মতো খাবার তাদের হাতের কাছেই সবসময় মজুত থাকছে। বার্গার, পিজ্জা, প্যাটি, নুডলসের প্রতি তাদের যতটা আগ্রহ দেখা যায়, ঘরে তৈরি সাধারণ খাবারের প্রতি ততটা অনীহা দেখা যায়।
এই পরিস্থিতিতে, শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার গুরুদায়িত্ব বর্তায় তাদের বাবা-মায়ের উপর। তবে এক্ষেত্রে হুট করে কঠোর নিয়ম চাপিয়ে দিলে বিপরীত ফল হতে পারে। ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে হবে তাদের রোজকার খাদ্যতালিকায়। পরিবারের সকল সদস্যকে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে এবং দু’বছর বয়সের পর থেকে শিশুদেরও সেই একই খাবার খাওয়ার অভ্যেস করানো জরুরি।
অনেক অভিভাবকই সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়োয় বাচ্চাদের শুধু এক গ্লাস দুধ আর একটা বিস্কুট দিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দেন। কারো কারো তো ঘুম থেকে উঠতেই এত দেরি হয়ে যায় যে, তারা না খেয়েই স্কুলে চলে যায়। মনে রাখতে হবে, ঘুম থেকে ওঠার এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুদের অবশ্যই কিছু না কিছু খেতে হবে, না হলে তাদের শরীরে এনার্জির অভাব দেখা দেবে। তাই দুধ, মুড়ি, কলা, সাধারণ কর্নফ্লেক্স, চিঁড়ের পোলাও অথবা জ্যাম-পিনাট বাটার স্যান্ডউইচের মতো খাবার খাইয়ে তবেই তাদের বাড়ির বাইরে যেতে দিন।
স্কুলের টিফিনে কী দেবেন, তা নিয়েও যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করা প্রয়োজন। বিভিন্ন রকমের সবজি মেশানো উপমা বা ভেজিটেবল ফ্রায়েড রাইস দেওয়া যেতে পারে। ফ্রায়েড রাইসের মধ্যে চিকেন বা ডিমও মেশানো যেতে পারে। চিকেন বা ডিম সেদ্ধ দিয়ে তৈরি স্যান্ডউইচও বাচ্চাদের কাছে খুবই পছন্দের হতে পারে। স্যান্ডউইচের জন্য স্প্রেড তৈরি করতে মেয়োনিজের বদলে বাড়িতে পাতা টক দই সারা রাত ঝুলিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে নিন। এরপর সামান্য নুন, মিষ্টি, সরষের গুঁড়ো বা কাসুন্দি, রসুন এবং ধনেপাতা কুচি মিশিয়ে সুস্বাদু ডিপ তৈরি করতে পারেন। এছাড়াও, শুকনো করে রান্না করা ঘুগনি বা ছোলাও টিফিনে দেওয়া যেতে পারে। ছানা, ডিম বা মুরগির পুর দিয়ে রুটি বা সামান্য তেলে ভাজা পরোটার রোলও একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। টিফিনে এমন কিছু খাবার দেওয়া উচিত নয়, যা থেকে রস বেরিয়ে ব্যাগ বা বইখাতা নষ্ট করে দিতে পারে। যদি ফল কেটে দেন, তবে তা অবশ্যই জিপ লক পাউচে ভরে দিন। রায়তার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। খাবারটি যেন দেখতে আকর্ষণীয় ও রঙিন হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
খাবারকে আরও সুস্বাদু করে তোলার জন্য সামান্য নুন, গোলমরিচ, চিনি, লেবুর রস অথবা জিরা, ধনে ও গরম মশলা শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করে মেশাতে পারেন। তবে খাবারে অতিরিক্ত তেল, চিনি বা নুন ব্যবহার করলে শিশুর জিভে সেই স্বাদের প্রতি আসক্তি তৈরি হবে এবং তখন তারা হালকা ও সহজে হজমযোগ্য খাবার খেতে চাইবে না। তাই রান্নার সময় এই বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন ও মিনারেলসের সঠিক ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। এছাড়াও, দুধ বা ছানা, প্রক্রিয়াজাত না হওয়া চিজ, দই ইত্যাদিও শিশুদের খাওয়াতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এমন কথা বলা উচিত নয়, ‘আপেলটা খেয়ে নাও, তাহলে চকোলেট দেবো’, কারণ এতে তাদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যাবে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি পরিবারের সকলে মিলে একই স্বাস্থ্যকর নিয়ম মেনে খাবার খান।
বাড়িতেই মরশুমি ফলের রস, ফুল ফ্যাট দুধ বা ইয়োগার্ট দিয়ে চমৎকার আইসক্রিম তৈরি করা সম্ভব। কোল্ড কফি বা মিল্ক শেক বানানোও খুব সহজ। বাইরে থেকে কিনে না খাইয়ে, বরং ঘরেই তৈরি করুন এবং প্রয়োজনে বাচ্চাদেরও সেই কাজে সঙ্গে নিন। কেক বা কুকিজও বাড়িতে তৈরি করতে পারলে ভালো, কারণ সেক্ষেত্রে আপনি রেসিপিগুলিকে স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারবেন। অতিরিক্ত চিনি বা ময়দার বদলে মধু, ড্রাই ফ্রুট বা আমন্ডের ময়দা ব্যবহার করে কেক-বিস্কুট তৈরি করা যায়। ময়দার পরিবর্তে ওটস দিয়ে প্যানকেকও একটি স্বাস্থ্যকর বিকল্প। আজকাল বাচ্চাদের পছন্দের খাবার স্বাস্থ্যকর উপায়ে বানানোর জন্য প্রচুর অ্যাপ ও রান্নার বই পাওয়া যায়। হাতের কাছে তেমন কিছু রাখলে উপকার পাওয়া যাবে।