বন্ধুত্ব ভেঙে কেন চিরশত্রু ইরান-ইসরায়েল? পরমাণু কর্মসূচিতে নিষেধাজ্ঞা, এবার কী তবে যুদ্ধের পথে মধ্যপ্রাচ্য?

২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে আমেরিকা ২০১৮ সালে বেরিয়ে যাওয়ার পর এবার ইউরোপীয় মিত্ররাও ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিল। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং জার্মানি চুক্তির শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া পুনর্বহাল করার ব্যবস্থা নেওয়ায়, গত সপ্তাহেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাগুলি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইরানের উপর পুনরায় আরোপিত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল নিষেধাজ্ঞার আরেকটি দফা নয়— এটি একটি ‘পূর্ণাঙ্গ, শ্বাসরুদ্ধকর নিষেধাজ্ঞা’। এই পদক্ষেপ ইরানের অর্থনীতিকে মারাত্মক সঙ্কটের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং দেশটির সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে আনবে।

‘দুঃখ সূচকের’ সর্বোচ্চ সীমায় ইরান: অর্থনৈতিক বিপর্যয়
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক শাহিন মোদারেসের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলি ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেবে:

ব্যাংকিং চ্যানেল অবরুদ্ধ: আন্তর্জাতিক লেনদেন এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে।

তেল রপ্তানি শ্বাসরুদ্ধ: ইরানের প্রধান আয়ের উৎস, তেল রপ্তানি, প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

মুদ্রার পতন ও মুদ্রাস্ফীতি: এর ফলে ইরানের মুদ্রার পতন ঘটবে, আমদানি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে এবং মুদ্রাস্ফীতি ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেবে।

‘দুঃখ সূচক’ বৃদ্ধি: মোদারেস উল্লেখ করেন, বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতির সংমিশ্রণ— যা অর্থনীতিবিদদের কাছে ‘দুঃখ সূচক’ নামে পরিচিত— তা ইরানে ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা নিষেধাজ্ঞার কারণে আরও বাড়বে।

জার্মান-ইরানি পদার্থবিদ বেহরুজ বায়াত মনে করেন, শেষ পর্যন্ত যদি শাসনব্যবস্থা ভেঙেও যায়, তবে তার চরম মূল্য দিতে হবে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণিসহ সাধারণ জনগণকে।

ইসরায়েল-ইরান সম্পর্ক: বন্ধু থেকে শত্রুতে পরিণত
একদিকে যখন ইরানের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে, তখন অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরান ও ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের বৈরিতা আরও প্রকট হচ্ছে। তবে এই দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় এমন ছিল না।

যুগ সম্পর্ক এবং প্রধান ঘটনা
১৯৪৮-১৯৭৯ (শাহ পাহলভির যুগ) বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা: মধ্যপ্রাচ্যে ইরানই প্রথম দেশগুলির মধ্যে ছিল, যারা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। তেলসমৃদ্ধ ইরান ইসরায়েলকে জ্বালানি সরবরাহ করত এবং ইসরায়েল বিনিময়ে ইরানের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণে সহযোগিতা করত।
১৯৭৯ (ইসলামি বিপ্লব) সম্পর্কের মোড় বদল: আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লবের পর ইরান ইসরায়েলকে এলাকার জন্য হুমকি মনে করে এবং ‘মুছে ফেলার’ হুমকি দেয়।
আশির দশক থেকে প্রক্সি গ্রুপ ও বৈরিতা: ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ফিলিস্তিনের হামাস-এর মতো ইসরায়েলবিরোধী গোষ্ঠীগুলিকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ শুরু করে, যা সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটায়।
সাম্প্রতিক পরমাণু কর্মসূচি ও সংঘর্ষ: ইরানের গোপন পরমাণু কর্মসূচি ইসরায়েলের অস্তিত্ব সংকটের কারণ বলে মনে করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের সেনাপ্রধান ও বিজ্ঞানীদের গুপ্তহত্যা (যার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়) এবং সাগরে ছায়াযুদ্ধের মাধ্যমে বৈরিতা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে।

Export to Sheets
আমেরিকা কি ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছে?
শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (Regime Change) নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠলেও, বিশ্লেষকরা মনে করেন বিষয়টি এত সহজ নয়।

মার্কিন উদ্দেশ্য: বিশ্লেষক শাহিন মোদারেসের মতে, নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার লক্ষ্য হলো ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা, তবে তা সরাসরি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজনীয়তা: শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন একটি বাস্তব লক্ষ্যে পরিণত হতে হলে হোয়াইট হাউস, কংগ্রেস, আমেরিকার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে মিত্রদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

জাতিসংঘের ৪১ ও ৪২ অনুচ্ছেদ: যুদ্ধের আশঙ্কা
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি, জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে ইরানকে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ৪১ ও ৪২ অনুচ্ছেদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

অনুচ্ছেদ ৪১: এটি সশস্ত্র শক্তির ব্যবহার না করে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার মাধ্যমে জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অনুমতি দেয়।

অনুচ্ছেদ ৪২: এই অনুচ্ছেদ ইঙ্গিত দেয় যে, যদি ৪১ অনুচ্ছেদের পদক্ষেপগুলি অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়, তবে নিরাপত্তা পরিষদ আকাশ, সমুদ্র বা স্থল বাহিনীর মাধ্যমে সামরিক অভিযানের মতো পদক্ষেপ নিতে পারে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৪১ অনুচ্ছেদ সামরিক পদক্ষেপের অনুমোদন দেয় না, তবুও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সবসময় কঠোরভাবে আইনি কাঠামো মেনে চলে না— এই বিষয়টিই মধ্যপ্রাচ্যে একটি সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা জাগিয়ে তুলছে।