দেবী চণ্ডীর স্বপ্নাদেশ! ১৭ শতকের প্রথা মেনে চাঁচল রাজবাড়ি থেকে মৃন্ময়ী দুর্গার পাশে এলেন ‘সিংহবাহিনী’, কী সেই অলৌকিক গল্প?

মালদহের উত্তরাংশ এবং বিহারের কিছু অংশের এক সময়ের দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা রামচন্দ্র রায়চৌধুরী সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে যে পুজোর পত্তন করেছিলেন, সেই চাঁচল রাজবাড়ির দুর্গাপূজা আজও প্রাচীন প্রথা ও রাজকীয় ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। সোমবার, মহাসপ্তমীর ঊষালগ্নে সেই ঐতিহ্য মেনে রাজবাড়ি থেকে অষ্টধাতুর মা চণ্ডীকে চার কিলোমিটার দূরে পাহাড়পুর দুর্গাদালানে নিয়ে যাওয়া হলো।

এদিনের এই শোভাযাত্রায় রাজকীয় উপাচার ছিল দেখার মতো। প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটে চতুর্ভূজা, সিংহবাহিনী মা চণ্ডীকে নিয়ে যাওয়া হয় মন্দির অভিমুখে। প্রথা অনুযায়ী, যাত্রার শুরুতে সোনার ঝাড়ু দিয়ে মায়ের পথ পরিষ্কার করা হয় এবং রাজ ঐতিহ্য মেনে চাঁদির পাখা দিয়ে মাকে হাওয়া দিতে-দিতে শোভাযাত্রা এগিয়ে চলে। এই প্রাচীন অনুষ্ঠানে এদিন সামিল হয়েছিলেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যার ফলে চার কিলোমিটার পথ ছিল লোকারণ্য।

দেবী চণ্ডীর অলৌকিক স্বপ্নাদেশ

এই পুজোর ইতিহাস জড়িয়ে আছে এক অলৌকিক স্বপ্নাদেশের সঙ্গে। কথিত আছে, রাজা রামচন্দ্র রায়চৌধুরীকে দেবী চণ্ডী স্বয়ং স্বপ্নাদেশ দেন যে মহানন্দার সতীঘাটে তাঁর অষ্টধাতুর মূর্তি রয়েছে। রাজমাতাকে দিয়ে সেই মূর্তি নদী থেকে তুলে এনে রাজাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দেবীর আদেশ মেনে রাজা সেই মূর্তি রাজবাড়ির মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিত্যপূজা শুরু হয়। পরে ফের দেবীর স্বপ্নাদেশ আসে—রাজবাড়িতে নয়, সতীঘাটে মায়ের মন্দির নির্মাণ করে সেখানে মৃণ্ময়ী মা দুর্গার সঙ্গে তাঁকে একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মায়ের নির্দেশেই সতীঘাটে খড়ের ছাউনিযুক্ত মাটির মন্দিরে দেবীর দুই রূপের পুজো শুরু হয়। বর্তমানে রাজা রামচন্দ্রের প্রপৌত্র শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরীর নির্দেশে পাহাড়পুরে মায়ের পাকা মন্দির নির্মিত হয়। সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পুজোয় সেই প্রাচীন সমস্ত রীতি আজও অক্ষুণ্ণ।

মৃন্ময়ীর পাশে মা চণ্ডী: ৪ দিনের আরাধনা

এদিন সকালে মরা মহানন্দায় পাহাড়পুর দুর্গাদালানের কলাবউয়ের স্নান সারা হতেই রাজবাড়ি থেকে বের করা হয় অষ্টধাতুর মা চণ্ডীকে। রাজবাড়ির নিত্যপূজারি ভোলানাথ পাণ্ডে সেখানকার মন্দির থেকে মাকে বিদায় দেন। ঢাক-ঢোল ও ব্যান্ড পার্টির বাজনায় মাকে ক’দিনের জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পাহাড়পুরে।

পাহাড়পুর দুর্গাদালানের পুজোর দায়িত্বে থাকা টিটো বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, “রাজবাড়ি থেকে আজ মা সিংহবাহিনীকে এই মন্দিরে আনা হলো। দশমী পর্যন্ত তিনি এখানে থাকবেন। পুরনো রীতি অনুযায়ী এই চারদিন মায়ের স্নান, অন্নভোগ এখানেই হবে। প্রথম থেকেই মহাষ্টমী তিথিতে এখানে কুমারীপুজো হয়। দশমীর দিন মাকে ধুমধাম করে রাজবাড়িতে রেখে আসা হবে।”

বিসর্জনে বিশেষ প্রথা

দশমী তিথিতে মা চণ্ডীকে রাজবাড়ির মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হলেও, মৃন্ময়ী মা দুর্গা বিসর্জিত হন মহানন্দার সতীঘাটে। এই বিসর্জনেরও একটি বিশেষ প্রথা রয়েছে। দশমীর গোধূলি লগ্নে মায়ের বিসর্জন হয়। চাঁচলের বাসিন্দা সন্দীপন দাস জানান, সেই সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ মাকে নদীর ঘাট পর্যন্ত আলো দেখান। আগে লণ্ঠনের আলোয় পথ দেখানো হলেও, এখন তা মোবাইল ফোনের টর্চ দিয়ে করা হয়। যে ঘাটে এক রাজমাতা সহমরণে গিয়েছিলেন, সেই সতীঘাটেই মৃন্ময়ী মায়ের বিসর্জন হয়ে আসছে।