অদ্ভুত প্রথা, যে রাজবাড়ির দুর্গাপুজোয় আজও ব্রাত্য নারীরা

দুর্গাপুজোয় নারীশক্তির আরাধনা করা হলেও, পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরে অবস্থিত নাড়াজোল রাজবাড়ির পুজোয় নারীরাই ব্রাত্য। প্রায় ৬১২ বছর ধরে এই রাজবাড়িতে চলে আসা এক অদ্ভুত প্রথায় মহিলারা মায়ের অঞ্জলি দিতে পারেন না, এমনকি প্রসাদও গ্রহণ করতে পারেন না।

রাজবাড়ির ইতিহাস
নাড়াজোল রাজবাড়ির পুজো শুরু হয়েছিল ৮২০ বঙ্গাব্দে (অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ৬১২ বছর আগে)। কথিত আছে, বর্ধমানের রাজার নায়েব উদয়নারায়ণ ঘোষ শিকারে এসে এক অলৌকিক ঘটনা দেখে স্বপ্নাদেশ পান। দেবী দুর্গা তাঁকে জঙ্গলে পড়ে থাকা অষ্টধাতুর মূর্তি উদ্ধার করে পূজা শুরু করার নির্দেশ দেন। এরপর সেই মূর্তি দিয়ে উদয়নারায়ণ ঘোষ এই রাজবাড়িতে পুজোর সূচনা করেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরদের উপাধি ‘খান’ হয় এবং এই পরিবারটি ‘খান’ পরিবার নামে পরিচিতি পায়।

বিপ্লবীদের ঘাঁটি নাড়াজোল
এই রাজবাড়ির সঙ্গে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বিপ্লবীদের এক গভীর সম্পর্ক ছিল। রাজা নরেন্দ্রলাল খান ও তাঁর পুত্র দেবেন্দ্রলাল খান ছিলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক। ক্ষুদিরাম বসুর বাবা ত্রৈলোক্যনাথ বসু এই রাজবাড়ির প্রধান কর্মচারী ছিলেন। একসময় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলাম-সহ জওহরলাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধীও এই ঐতিহাসিক বাড়িতে এসেছিলেন।

পুজোর প্রথা ও নিয়ম-কানুন
নারী ব্রাত্য: এই পুজোর সবচেয়ে অদ্ভুত নিয়ম হলো নারীরা মায়ের অঞ্জলি দিতে এবং প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন না। তবে দেবীকে বিদায় জানানোর সময় তাঁরা সিঁদুর খেলায় অংশ নিতে পারেন।

অষ্টধাতুর মূর্তি: এখানে দেবী দুর্গা একা পূজিত হন। তাঁর সঙ্গে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী বা সরস্বতী থাকেন না।

বিসর্জন নয়: যেহেতু এটি অষ্টধাতুর প্রতিমা, তাই বিসর্জন হয় না। কেবল ঘট নিরঞ্জন দেওয়া হয়।

বলি প্রথা নেই: এখানে বৈষ্ণব মতে পূজা হয় বলে কোনো পশু বলি প্রথা নেই।

ঐতিহ্যের ভগ্নদশা
ঐতিহাসিক এই রাজবাড়ির জৌলুস এখন ফিকে হয়ে এসেছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর বহু ভবন ভগ্নপ্রায় এবং আগাছায় ঢেকে গেছে। তবুও নিয়ম মেনে প্রতি বছর এখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে বহু মানুষ এই ব্যতিক্রমী পুজো দেখতে ভিড় জমান।