আগামী ১৭’ই ভাদ্র ‘মা’ আবার আমাদের মঙ্গল কামনায় আসছেন! জেনেনিন মনসা পুজোর ইতিহাস ও মাহাত্ম্য

আগামী ১৭ ভাদ্র মনসা দেবীর পূজা। বাংলার লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এই পূজা। মনসা হলেন সাপের দেবী, যিনি মূলত সাপের দংশন থেকে রক্ষা, পারিবারিক মঙ্গল ও সমৃদ্ধির জন্য পূজিত হন। সারা বছর ধরে এই দেবীর পূজা করা হলেও, বিশেষ করে বর্ষাকালে এর প্রচলন বেশি।
মনসা পূজার ইতিহাস
মনসা পূজার ইতিহাস মূলত মনসামঙ্গল কাব্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই কাব্যের মূল কাহিনীতে চাঁদ সদাগর এবং বেহুলা-লখিন্দরের গল্প রয়েছে।
চাঁদ সদাগরের অহংকার: চাঁদ সদাগর ছিলেন একজন শিবভক্ত এবং তিনি মনসা দেবীর পূজা করতে অস্বীকার করেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে মনসা দেবী তার ছয় পুত্রকে সাপের কামড়ে মেরে ফেলেন।
বেহুলার সাধনা: চাঁদ সদাগরের কনিষ্ঠ পুত্র লখিন্দরকেও সাপে কাটলে, তার স্ত্রী বেহুলা স্বামীর মৃতদেহ ভেলায় ভাসিয়ে দেবলোকে যাত্রা করেন। বেহুলার ভক্তি ও কঠোর তপস্যায় দেবতারা সন্তুষ্ট হন এবং তার স্বামীকে জীবিত করার জন্য মনসাকে অনুরোধ করেন।
মনসার বিজয়: মনসা লখিন্দরকে জীবিত করেন এই শর্তে যে, চাঁদ সদাগর তার পূজা করবেন। অবশেষে চাঁদ সদাগর অনিচ্ছাসত্ত্বেও মনসার পূজা করেন এবং সমাজে মনসা পূজার প্রচলন শুরু হয়।
এই কাহিনীর মাধ্যমে সমাজে মনসা পূজার গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
পূজার নিয়মকানুন ও সামাজিক গুরুত্ব
মনসা পূজা সাধারণত বর্ষাকালে (আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র মাসে) অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষত নাগপঞ্চমীর দিনে এই পূজা প্রচলিত।
পূজার উপকরণ: পূজায় ঘট, হলুদ, সিঁদুর, ধূপ, প্রদীপ, দুধ, ডাব, ও শস্যদানা ব্যবহার করা হয়। অনেক সময় মাটির তৈরি দেবী প্রতিমাও ব্যবহার করা হয়।
আচার: পূজার সময় উপবাস বা নিরামিষ ভোজন করা হয় এবং মনসামঙ্গল কাব্য পাঠ করা হয়। পারিবারিক মঙ্গল এবং সাপের ভয় থেকে রক্ষার জন্য প্রার্থনা করা হয়।
মনসা পূজা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি প্রকৃতির সাথে মানুষের সম্পর্ক এবং লোককথার ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। এই পূজার মাধ্যমে বাংলার সমাজে নারীর ভক্তি ও সংসারের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রতিফলন দেখা যায়।
মনসা মায়ের মন্ত্র
মনসা পূজায় বিভিন্ন ধরনের মন্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। কিছু সাধারণ মন্ত্র হলো:
বিনয় মন্ত্র: ওঁ মনসাদেব্যৈ নমঃ
সাপ দংশন থেকে রক্ষার মন্ত্র: ওঁ হ্রীং মনসাদেবী, সর্বনাগেশ্বরী পূজিতা ভবা। সর্বদা সাপদংশনম নাশয় নাশয় স্বাহা॥
প্রতিষ্ঠা মন্ত্র (ঘট স্থাপনের সময়): ওঁ অষ্টনাগসহিতায়ৈ মনসাদেব্যৈ নমঃ
এছাড়াও মনসামঙ্গল কাব্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন লোকগীতি ও পালাগানের মাধ্যমে দেবীর মহিমা বর্ণনা করা হয়। এই পূজা বাংলার গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা বিশ্বাস এবং ভক্তির মাধ্যমে মানুষের মনে টিকে আছে।