বর্ষার মরশুমে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির পাতে ইলিশ এক আবেগের নাম। এই বছর, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মৎস্যজীবীরা মাত্র ১৫-২০ দিনের মতো গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে পেরেছেন। তা সত্ত্বেও, প্রচুর পরিমাণে ইলিশ ধরা পড়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাজারে ইলিশের দাম এখনও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। প্রশ্ন উঠছে, কেন অর্থনীতির সাধারণ সূত্র, অর্থাৎ জোগান বাড়লে দাম কমা, এখানে কার্যকর হচ্ছে না?
মৎস্যজীবী এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে এক নতুন ধরনের কারসাজি। বড় ব্যবসায়ীরা, যাঁরা সাধারণত আলু বা পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্যে বিনিয়োগ করেন, তাঁরা এখন ইলিশের বাজারেও ঢুকছেন। তাঁরা মাছ ধরার পরপরই বিপুল পরিমাণ ইলিশ কিনে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করছেন। পরে বাজারে ইলিশের কৃত্রিম ঘাটতি তৈরি করে উচ্চ দামে তা বিক্রি করা হচ্ছে।
মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মৎস্যজীবীরা খুব কম সময়ই মাছ ধরতে পেরেছেন। তা সত্ত্বেও, যে পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়েছে, তা স্বাভাবিক সময়ে বাজারকে কিছুটা হলেও স্থিতিশীল রাখতে পারত। কিন্তু কোল্ড স্টোরেজে মাছ মজুত করার ফলে বাজারে প্রকৃত জোগান বাড়ছে না।
বর্তমানে বাজারে ৫০০-৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ পাইকারি দরে প্রতি কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি হলেও, খুচরো বাজারে তার দাম ৮০০-১০০০ টাকা। এই অস্বাভাবিক দামের ফারাক সাধারণ ক্রেতাদের ভোগাচ্ছে। একজন বর্ষীয়ান মৎস্যজীবী বলেন, “আমরা যে মাছ ধরি, তার বেশিরভাগই বড় ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়। তারা হাজার হাজার কেজি মাছ একবারে কিনে নেয়। ফলে বাজারে চাহিদা থাকলেও জোগান কমে যায়, তখন দাম বাড়ে।”
বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতির জন্য সরকারি নজরদারির অভাবকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, সরকার কেবল মাছ ধরার পরিমাণের ওপর নজর রাখলেই হবে না, বাজারে তার সঠিক ও ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করাও সরকারের দায়িত্ব। এই নিয়ন্ত্রণ না থাকলে ভবিষ্যতেও বড় ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে সাধারণ ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
তবে মৎস্যজীবীদের আশা, সামনে যদি আবহাওয়া অনুকূল থাকে, তাহলে আরও বেশি মাছ ধরা পড়বে এবং বাজারে প্রকৃত জোগান বাড়বে। কিন্তু তাতেও যদি দাম না কমে, তবে তা প্রমাণ করবে যে সমস্যা কেবল প্রকৃতি বা জোগান নিয়ে নয়, বরং বাজার ব্যবস্থার গভীর ‘খেলা’-র জন্যই। এই খেলা বন্ধ করা না গেলে ইলিশ হয়তো মধ্যবিত্তের পাতে না থেকে শুধুই কল্পনা হয়ে থাকবে।





