শিলিগুড়ি পুরসভায় ধুন্ধুমার, মেয়র-ডেপুটি মেয়রের নির্দেশে মেয়র পারিষদকে ‘বের করে দেওয়া’র অভিযোগ

শিলিগুড়ি পুরনিগমের বোর্ড মিটিংয়ে আজ এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা এবং তীব্র বাকবিতণ্ডা প্রত্যক্ষ করল। অভিযোগ, মিটিং চলাকালীন মেয়র পারিষদ সদস্য দিলীপ বর্মনকে কার্যত ধমক দিয়ে সভা কক্ষ থেকে বের করে দিয়েছেন মেয়র গৌতম দেব ও ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার। এই ঘটনা শিলিগুড়ি পুরনিগমের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে, যা নিয়ে শহর জুড়ে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।

বিতর্কের সূত্রপাত: অবৈধ নির্মাণ ও খাটাল উচ্ছেদ
বুধবার আয়োজিত শিলিগুড়ি পুরনিগমের বোর্ড মিটিংয়ে ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং ক্রীড়া, হাউজিং ফর অল ও ট্রেড লাইসেন্স বিভাগের মেয়র পারিষদ সদস্য দিলীপ বর্মন একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উত্থাপন করেন। তিনি জানান, তাঁর ওয়ার্ডে থাকা অবৈধ নির্মাণ এবং নদীর চরে থাকা খাটাল উচ্ছেদের বিষয়ে একাধিকবার পুরনিগমকে জানানো সত্ত্বেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি, তিনি আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করেন যে, এদিনও যখন অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে পুরকর্মীরা গিয়েছিলেন, তখন ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার ফোন করে তাঁদের বাধা দেন এবং ফেরত চলে আসার নির্দেশ দেন। এই বিষয়টি জানা মাত্রই দিলীপ বর্মন বোর্ড মিটিংয়ে ওই প্রসঙ্গ তোলেন।

বচসা ও বহিষ্কার
দিলীপ বর্মন এই প্রসঙ্গ তুলতেই সভার চেয়ারম্যান তাকে বাধা দেন। এরপরই মেয়র পারিষদ সদস্য দিলীপ বর্মন এবং ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকারের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, শাসক দলের অন্যান্য নেতারাও বিব্রতবোধ করেন। এরপরই ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার ধমক দিয়ে দিলীপ বর্মনকে মিটিং থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে মেয়র গৌতম দেবও মেয়র পারিষদ সদস্যকে সভা ত্যাগ করতে নির্দেশ দেন। ফলস্বরূপ, দিলীপ বর্মনকে কার্যত জোর করেই বোর্ড মিটিং থেকে বের করে দেওয়া হয়।

দিলীপ বর্মনের বিস্ফোরক অভিযোগ: ‘চোরে চোরে মাসতুতো ভাই’, ‘টাকার লেনদেন’
মিটিং থেকে বেরিয়ে এসেই মেয়র পারিষদ দিলীপ বর্মন একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ করেন, যা শিলিগুড়ি পুরনিগমের অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, “আমার কাজে প্রথম থেকে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমিও ছাড়ব না। মেয়র ও ডেপুটি মেয়র এখন চোরে-চোরে মাসতুতো ভাই। টাকা পয়সার লেনদেন না-হলে এসব হবে কেন?”

তিনি আরও বলেন, “মেয়র শুধু একটা কথাই বলে যাচ্ছেন দীর্ঘদিন ধরে যে, আমাকে চিন্তা করতে হবে। কিন্তু এলাকার মানুষ আমাকে এসে ধরছে। আমি তো এর দায়িত্ব নেব না।” দিলীপ বর্মন দাবি করেন, “পুরনিগমে দালাল আছে। তারাই চাইছে না খাটাল উঠুক। ডেপুটি মেয়রের খাস লোক ওই খাটালের মালিক। সেই মূলত উস্কানি দিচ্ছে পিছন থেকে। কত টাকা ওখান থেকে তিনি পেয়েছেন তা বলতে হবে।”

মেয়র ও ডেপুটি মেয়রের প্রতিক্রিয়া
এই অভিযোগের জবাবে শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব বলেন, “দিলীপ বর্মন যে দুর্নীতির অভিযোগ করছেন সেটা প্রমাণ করতে হবে। আমরা দুর্নীতি করিনি। যাবতীয় বিষয়ে আলোচনা করা হবে। আর যেখানে জানানোর সেখানে জানাব।” অন্যদিকে, ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “অবৈধ নির্মাণ ভাঙা আমার বিভাগ নয়। আমার এসব বিষয়ে জানা নেই। আমি গুরুত্ব দিতে চাই না।”

বিরোধীদের কটাক্ষ ও চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা
কর্পোরেশনের বিরোধী দলনেতা অমিত জৈন এই ঘটনাকে ‘গণতন্ত্রের অভাব’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, “আজকে এই পুর বোর্ড অবৈধভাবে এসব কাজ করছে এটা পরিষ্কার। আজকে একজন মেয়র পারিষদকে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। এতেই বোঝা যায় যে কোনো গণতন্ত্র নেই।” তবে চেয়ারম্যান প্রতুল চক্রবর্তী যুক্তি দিয়ে বলেছেন, “বোর্ড মিটিংয়ের একটি নিয়ম আছে। ট্রেজারি বেঞ্চে থেকে প্রশ্ন করা যায় না। তাই তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হয়েছে।”

এই ঘটনা শিলিগুড়ি পুরনিগমের অন্দরে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতির অভিযোগকে সামনে এনে দিয়েছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy