কলকাতার ফুটপাতের ছাতু বিক্রেতা ইন্দ্রদেব, বাংলা আমাকে অপমান করে না

কর্মভূমি আর জন্মভূমির টানাপোড়েনে যখন রাজনীতি উত্তপ্ত, তখন কলকাতার বুকে এক ছাতু বিক্রেতা যেন ভিন্নতার মাঝে ঐক্যের সুর বাজাচ্ছেন। বিহারে জন্ম হলেও গত ৪৫ বছর ধরে কলকাতাকেই নিজের ঠিকানা করে নিয়েছেন প্রায় পঁয়ষট্টি বছর বয়সী ইন্দ্রদেব সাউ। গান্ধী মূর্তির পাদদেশের উল্টো দিকের ফুটপাতে ত্রিপল খাটিয়ে, ঘাসের ওপর বসে তাঁর ছাতুর শরবত ও ছাতু মাখানির পসরা, যা প্রতিদিন বহু বাঙালি-অবাঙালির কাছে এক প্রিয় আস্তানা।

সংগ্রামের শুরু ১৫ বছর বয়সে:
খুব ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে কলকাতায় এসেছিলেন ইন্দ্রদেব বাবু। পারিবারিক অভাব অনটনের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তাঁকে জীবিকার পথ বেছে নিতে হয়। সেই থেকে ছাতু বিক্রিই তাঁর প্রধান অবলম্বন। বিহারে তাঁর পরিবার, ছেলে-মেয়েরা থাকলেও এসএসকেএম হাসপাতালের কাছে একটি ভাড়া ঘরে একাই থাকেন তিনি।

রাজনীতির ডামাডোলে শান্তির বার্তা:
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যে, যেমন গুজরাট, ওড়িশা, হরিয়ানায় বাংলার শ্রমিকদের হেনস্থা ও “বাংলাদেশী” বলে চিহ্নিত করার অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়টি নিয়ে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস জোরদার রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করেছে। গত 16ই জুলাই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে প্রতিবাদও জানিয়েছেন।

তবে ইন্দ্রদেব সাউয়ের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি অকপটে বলেন, “আমাকে এখানে কেউ অপমান করে না। আমার ভাষা নিয়ে কেউ কথা বলে না। আমি বাংলাকে আপনা করে নিয়েছি। বাংলাও আমাকে আপন করে নিয়েছে। নইলে ৪৫ বছর ধরে কী করে কাটালাম এই বাংলায়?”

তাঁর এই উক্তি যেন সহাবস্থানের এক জীবন্ত উদাহরণ। তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলায় থাকতে গেলে অপমানিত হতে হয় না। জন্ম সার্টিফিকেট দিতে হয় না। হিন্দি ভাষা হলেও তাচ্ছিল্য করা হয় না। উল্টে বাংলার আনাচে কানাচে নানান ভাষাভাষীরা স্থায়ী বাসস্থান গড়ে আছেন। এখানেই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির থেকে আলাদা বাংলা।”

সহমর্মিতার নতুন দিক:
ইন্দ্রদেব সাউয়ের এই মন্তব্যগুলি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন হিন্দিভাষী ও বাংলাভাষী মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা চলছে, তখন তাঁর মতো একজন সাধারণ মানুষ প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, পশ্চিমবঙ্গে ভাষা বা অঞ্চলের ভিত্তিতে কোনও ভেদাভেদ নেই। বরং এখানকার সংস্কৃতি বিভিন্ন ভাষাভাষীর মানুষকে উদারভাবে গ্রহণ করেছে।

আগামী 2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনের রূপরেখা তৈরিতে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলা ভাষার অস্মিতাকে একটি বড় হাতিয়ার করতে চাইছে, যার ইঙ্গিত ২১ জুলাইয়ের সভাতেও মিলেছে। বিরোধীরা যাই বলুক না কেন, ইন্দ্রদেব সাউয়ের মতো মানুষেরা যখন বলেন “বাংলা আমাকে অপমান করে না”, তখন বোঝা যায়, সহমর্মিতা আর মানবিকতার মূল্যবোধ এই রাজ্যের মাটি থেকে এখনও হারিয়ে যায়নি। কলকাতার ফুটপাত থেকে উঠে আসা এই সরল স্বীকারোক্তি যেন এক বৃহত্তর সামাজিক সত্যের প্রতিধ্বনি।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy