বাঙালির রান্নায় লঙ্কার উপস্থিতি এক অনিবার্য সত্য। কেউ ব্যঙ্গ করে ‘লঙ্কা কাণ্ড’ বলেন বটে, কিন্তু এই ঝাল স্বাদের উপাদানটি ছাড়া যেন অনেক পদের স্বাদই অসম্পূর্ণ। বিশেষত বাঙালদের কাছে তো লঙ্কা এক প্রাণের জিনিস, যা মুখে পড়লে অনেকের চোখে জল এলেও তাঁদের জিভে জল এনে দেয়। কিন্তু এই লঙ্কার ঝালের আড়ালে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অসামান্য স্বাস্থ্য উপকারিতা, যা হয়তো আমাদের অনেকেরই অজানা।
লঙ্কার প্রধান উপাদান হলো ক্যাপসাইসিন, যা কেবল এর ঝাঁঝালো স্বাদের জন্যই দায়ী নয়, বরং এর নানা ঔষধি গুণেরও মূল কারণ। বাঙালিরা ভাতের পাতে কাঁচা, ভেজে অথবা রোস্ট করে— বিভিন্ন রূপে লঙ্কা গ্রহণ করে থাকেন। আসুন, জেনে নেওয়া যাক এই সাধারণ লঙ্কা থেকে কী কী অসাধারণ স্বাস্থ্যগত সুবিধা পাওয়া যায়:
লঙ্কার ৯টি অত্যাশ্চর্য স্বাস্থ্য উপকারিতা:
১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক: লঙ্কায় উপস্থিত উপাদান ইনসুলিনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়তে দেয় না, যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।
২. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: লঙ্কা খেলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এতে থাকা পর্যাপ্ত ভিটামিন সি শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে তোলে।
৩. সর্দি-কাশি নিরাময়ে কার্যকর: সাধারণ সর্দি-কাশি এবং ঠান্ডাজনিত সমস্যায় লঙ্কা বেশ কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এর ঝাল উপাদান কফ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
৪. আয়রনের প্রাকৃতিক উৎস: লঙ্কায় প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে, যা রক্তাল্পতা প্রতিরোধে সাহায্য করে এবং শরীরের বিভিন্ন কোষে অক্সিজেনের সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত করে।
৫. উন্নত পরিপাক ক্রিয়া: লঙ্কার মধ্যে পর্যাপ্ত ফাইবার থাকায় এটি শরীরের পরিপাক ক্রিয়াকে মসৃণ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।
৬. ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি: লঙ্কায় থাকা ভিটামিন সি এবং ভিটামিন ই ত্বকের স্বাস্থ্য উন্নত করে এবং প্রাকৃতিক ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
৭. মেদ ঝরাতে সহায়ক: লঙ্কায় কোনো ক্যালোরি থাকে না এবং এটি দেহের বিপাকের হার (মেটাবলিজম) বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে ওজন কমানোর প্রক্রিয়ায় এটি একটি ভালো সহায়ক হতে পারে।
৮. হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য সুরক্ষায়: লঙ্কার মধ্যে যেহেতু প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, তাই এটি হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এটি রক্তনালীকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।
৯. হাড়ের স্বাস্থ্যে অবদান: লঙ্কার অভ্যন্তরে থাকা ভিটামিন কে, হাড় ক্ষয় যাওয়া রোগ বা অস্টিওপোরোসিস নিরাময়ে এবং হাড়কে মজবুত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিছু সতর্কতা:
তবে, যেকোনো কিছুর অতিরিক্ত সেবনই শরীরের জন্য ক্ষতিকর। লঙ্কার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। অতিরিক্ত লঙ্কা খেলে ত্বক এবং পাকস্থলীতে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়াও, অতিরিক্ত ঝাল খাওয়ার ফলে গ্যাস্ট্রিক আলসার বা পেটের অন্যান্য হজম সংক্রান্ত সমস্যা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অবশ্যই নিজের সহ্যক্ষমতা এবং স্বাদের ভারসাম্য বজায় রেখে লঙ্কা সেবন করা উচিত। মনে রাখা ভালো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাঁচা লঙ্কার গুণ বেশি বলে বিবেচিত হয়।