কিডনি, এক নীরব ঘাতক! আগাম লক্ষণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে জেনে নিন, বাঁচান আপনার জীবন

কিডনি রোগকে প্রায়শই ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে ধরা পড়ে, যখন শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়। তাই, সাবধান থাকার কোনো বিকল্প নেই। কিছু লক্ষণ এবং উপসর্গ প্রাথমিক পর্যায়েই প্রকাশ পেলেও, সেগুলোকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। সুতরাং, আপনার শরীরেও এমন কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিচ্ছে না তো? আসুন, কিডনি রোগের ঝুঁকি এবং আগাম লক্ষণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই।

কিডনি রোগের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণসমূহ (Risk Factors):
একজন ব্যক্তি যে সকল কারণে কিডনি রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, সেগুলো হলো:

উচ্চ রক্তচাপ: অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে কিডনির কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়।

দীর্ঘদিন পেইন কিলার গ্রহণ: ব্যথানাশক ওষুধ দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণ করলে কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস: রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা কিডনির ফিল্টারগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা কিডনি রোগের অন্যতম প্রধান কারণ।

হৃদরোগ: হৃদপিণ্ডের সমস্যার সাথে কিডনি রোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে, কারণ উভয়ই রক্তনালী সংক্রান্ত।

স্থুলতা: অতিরিক্ত ওজন কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস: যদি পরিবারে কারো কিডনি রোগের ইতিহাস থাকে, তবে আপনার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

ধূমপান বা মদ্যপানের অভ্যাস: এই অভ্যাসগুলো কিডনিসহ শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ক্ষতি করে।

অলস জীবন যাপন: শারীরিক কার্যকলাপের অভাব স্থুলতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ না করা: সুষম খাদ্যের অভাব কিডনির স্বাস্থ্যকে দুর্বল করে তোলে।

অতিরিক্ত কেমিক্যাল এক্সপোজার: বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসা কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

একুইট কিডনি ইনজুরির ইতিহাস: পূর্বে যদি আপনার হঠাৎ কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে, তবে ক্রনিক কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

কিডনি রোগের আগাম লক্ষণসমূহ – কোনোটিই অবহেলা করা উচিত নয়:
১. নিয়মিত খুব ক্লান্ত এবং যেকোন কাজে মনোযোগে অসুবিধা: সুস্থ কিডনি ‘এরিথ্রোপোয়েটিন’ নামক একটি হরমোন তৈরি করে, যা লোহিত রক্তকণিকা (অক্সিজেন বহনকারী) উৎপাদনে সাহায্য করে। কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে এই হরমোনের পরিমাণও কমে যায়, ফলে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন কমে যায়। এই অবস্থাকে ‘অ্যানিমিয়া’ বলে, যা ক্লান্তি এবং মনোযোগে অসুবিধার কারণ হয়।

২. ঠান্ডা অনুভূতি: স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেও যদি আপনার শীত শীত লাগে বা গরমের মধ্যেও ঠান্ডা অনুভূত হয়, তবে এটি অ্যানিমিয়ার লক্ষণ হতে পারে, যা কিডনি সমস্যার একটি উপসর্গ।

৩. শ্বাসকষ্ট: শ্বাসকষ্ট কিডনির সমস্যার সাথে দু’ভাবে সম্পর্কিত হতে পারে। প্রথমত, শরীরের অতিরিক্ত তরল ফুসফুসে জমে যেতে পারে, এবং দ্বিতীয়ত, অ্যানিমিয়ার কারণে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ কমে যায়। হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৪. অজ্ঞান হয়ে যাওয়া/মাথা ঘোরা: অ্যানিমিয়ার কারণে মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছালে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। যদি আপনি অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত হন, তবে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি।

৫. শরীরে চুলকানি: সুস্থ কিডনি শরীর থেকে সমস্ত বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়। কিন্তু কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে এই বর্জ্য পদার্থ রক্তে জমা হয়, যা ত্বকে তীব্র চুলকানির সৃষ্টি করে। নিজে নিজে চিকিৎসা না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।

৬. মুখ, হাত, পা এবং গোড়ালি ফুলে যাওয়া (ইডিমা): কিডনি যখন সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, তখন দেহ থেকে অতিরিক্ত তরল বের হতে পারে না। এই অতিরিক্ত তরল শরীরের বিভিন্ন স্থানে, যেমন – চোখের নিচে, হাত, পা বা গোড়ালিতে জমে গিয়ে ফুলে যায়, যা ‘ইডিমা’ নামে পরিচিত।

৭. ঘুমের সমস্যা: কিডনির সমস্যা থাকলে রক্তে টক্সিক উপাদান জমে যায়, যা ঘুমের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ (ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া) খুব বেশি দেখা যায়।

৮. অতিরিক্ত ইউরিনেশনের চাপ এবং বুদবুদ যুক্ত ইউরিন: কিডনির ফিল্টারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বারবার প্রস্রাবের চাপ অনুভূত হয়। এছাড়া, প্রস্রাবের সময় যদি বুদবুদ দেখা যায় (যেমন ডিম ফেটানোর পর ফেনা ফেনা ভাব), তবে সেটিও আমলে নেওয়া উচিত। প্রস্রাবের রুটিন, পরিমাণ বা রঙের যেকোনো পরিবর্তনকে গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে।

৯. নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ এবং ক্ষুধা কমে যাওয়া: কিডনির কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে বর্জ্য পদার্থ জমে থাকার কারণে কিডনি রোগীদের নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হওয়া (বিশেষ করে মেটালিক গন্ধ) এবং ক্ষুধা কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

১০. ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া: কিডনির সমস্যা হলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। আবার, যাদের রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাদের কিডনির জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পাশাপাশি, কিডনি রোগ হলে কোমর ব্যথা (ব্যাক পেইন) ও হতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
নিজের শরীরের যেকোনো পরিবর্তন ভালোভাবে খেয়াল করা উচিত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বা কোনো ধরণের অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ মতো নিয়মিত লিপিড প্রোফাইল, সিরাম ক্রিয়েটিনিন, অ্যালবুমিন বা জরুরি সব মেডিকেল টেস্ট করা উচিত।

মনে রাখবেন, কিডনি রোগের চিকিৎসা খুবই ব্যয়বহুল, তা ডায়ালাইসিস করা হোক কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপন করা হোক। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy