নীরব ঘাতক ডিপ্রেশন, জেনে নিন এর ৬টি ধরন ও লক্ষণসমূহ

জীবন মানেই হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের এক মিশ্র অনুভূতি। কিন্তু কিছু মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা তাদের সমস্ত স্বপ্নকে ভেঙে দেয় এবং তারা বিষণ্নতার অতলে তলিয়ে যান। অনেকেই নিজের অজান্তে এই মানসিক ব্যাধির শিকার হন, যা প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা না করালে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হতাশার বিভিন্ন ধরন এবং এর লক্ষণসমূহ সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

বিষণ্নতা কীভাবে প্রভাবিত করে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হতাশা প্রত্যেককে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। এর কারণ, লক্ষণ এবং নিরাময় প্রক্রিয়াও ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। একজনের বিষণ্নতার কারণ এবং লক্ষণ অন্যজনের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। তাই বিষণ্নতাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে এর বিভিন্ন ধরন সম্পর্কে জানা জরুরি।

ডিপ্রেশনের ৬টি প্রধান ধরন ও তাদের লক্ষণ
১. মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (MDD):
এটি ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশন নামেও পরিচিত এবং সবচেয়ে সাধারণ ধরনের বিষণ্নতা। আপাতদৃষ্টিতে একজন ব্যক্তির জীবন সুশৃঙ্খল এবং সফল মনে হলেও তিনি এই রোগে ভুগতে পারেন। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

কোনো কিছুতে আনন্দ না পাওয়া

ওজন বা ঘুমের ধরনে পরিবর্তন

দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি

নিজেকে মূল্যহীন বা অপরাধী মনে করা

কোনো কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা

মৃত্যু বা আত্মহত্যার চিন্তা

২. ডাইসথিমিয়া বা পার্সিসটেন্ট ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডার (PDD):
যদি কোনো ব্যক্তি দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিষণ্নতায় ভোগেন, তবে তাকে এই রোগের শিকার ধরা হয়। এটি বিষণ্নতার একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ। এর ফলে দৈনন্দিন কাজ বা সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। লক্ষণগুলো হলো:

গভীর দুঃখ ও হতাশার অনুভূতি

আত্মসম্মানহীনতা

সবকিছুর প্রতি আগ্রহ হারানো

ক্ষুধা বা ঘুমের ধরনে পরিবর্তন

মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তির সমস্যা

৩. প্রসবোত্তর বিষণ্নতা (PPD):
গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অনেক নারী এই বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন। এটি একটি গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা হতে পারে। এর লক্ষণগুলো হলো:

খিটখিটে মেজাজ এবং ঘন ঘন মন খারাপ হওয়া

সামাজিক যোগাযোগ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া

সন্তানের যত্ন নিতে অনীহা

নিজেকে বা সন্তানকে আঘাত করার প্রবণতা

অসহায় বোধ করা এবং আত্মহত্যার চিন্তা

৪. ম্যানিক ডিপ্রেশন বা বাইপোলার ডিসঅর্ডার:
এটি একটি মেজাজ পরিবর্তনের ব্যাধি। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা দীর্ঘ সময় ধরে বিষণ্নতায় ভোগার পর হঠাৎ করে তাদের মেজাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যায়। এই পরিবর্তনের সময় তারা অত্যধিক আত্মবিশ্বাসী বা খিটখিটে হয়ে ওঠেন। এর লক্ষণগুলো হলো:

গভীর দুঃখ বা শূন্যতার অনুভূতি

শক্তির অভাব এবং ক্লান্তি

ঘুমের সমস্যা

মাঝে মাঝে অস্বাভাবিক শক্তি বেড়ে যাওয়া

৫. অ্যাটিপিক্যাল ডিপ্রেশন (AD):
এই ধরনের বিষণ্নতা নীরব ঘাতকের মতো। রোগীরা নিজেরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে তারা বিষণ্নতায় ভুগছেন। এর লক্ষণগুলো সাধারণত বিষণ্নতার চিরাচরিত লক্ষণগুলির থেকে ভিন্ন হয়:

অতিরিক্ত খাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধি

অতিরিক্ত ঘুমানো

উগ্র মেজাজ

শারীরিক দুর্বলতা, ব্যথা এবং যন্ত্রণা

৬. সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার (SAD):
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের বিষণ্নতা দেখা দেয়। সাধারণত শীতকালে এই সমস্যা দেখা যায় এবং শীত শেষ হলে তা স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর লক্ষণগুলো হলো:

সামাজিক প্রত্যাহার

ওজন বৃদ্ধি

অতিরিক্ত ঘুম

দুঃখ, নিরাশা বা মূল্যহীন বোধ করা

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি কোনো ব্যক্তি উপরোক্ত লক্ষণগুলির মধ্যে কোনোটি অনুভব করেন, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করালে বিষণ্নতা থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব এবং এটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে না।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy