শিল্পের শ্মশানভূমি বাংলা? ১৪ বছরে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়েছে ৬৬৮৮টি সংস্থা, প্রকাশ্যে সেই তালিকা

বাংলায় শিল্প নেই – এই অভিযোগ বিরোধীরা বারেবারে তুললেও, এবার প্রকাশ্যে এল এক চাঞ্চল্যকর সরকারি তথ্য যা এই দাবিকে সিলমোহর দিল। গত ১৪ বছরে পশ্চিমবঙ্গের মাটি ছেড়েছে ৬ হাজার ৬০০-এরও বেশি কোম্পানি। এই তথ্য শুধু শিল্পের বেহাল দশা তুলে ধরছে না, বরং রাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চিত্র এবং বাড়তে থাকা বেকারত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই ভয়ঙ্কর তথ্য সামনে আনেন। তিনি দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলে, অর্থাৎ ২০১১ সালের ১লা এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত, ৬৬৬৮টি কোম্পানি তাদের নিবন্ধিত অফিস পশ্চিমবঙ্গ থেকে অন্য রাজ্যে সরিয়ে নিয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক কোম্পানির মধ্যে ১১০টি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, যা এই স্থানান্তরের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেয়।
কোথায় গেল বাংলার শিল্প?
প্রশ্ন উঠছে, বাংলার মাটি ছেড়ে এই কোম্পানিগুলো পাড়ি দিল কোথায়? কেন্দ্রের তথ্য বলছে, শিল্পবান্ধব পরিবেশের খোঁজে এই সংস্থাগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি কোম্পানি স্থানান্তরিত হয়েছে মহারাষ্ট্রে (১৩০৮টি), এরপরই রয়েছে দিল্লি (১২৯৭টি)। এছাড়াও, উত্তর প্রদেশে ৮৭৯টি, ছত্তিশগড়ে ৫১১টি, গুজরাতে ৪২৩টি এবং রাজস্থানে ৩৩৩টি কোম্পানি তাদের ঠিকানা বদলেছে। অসম, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু এবং তেলেঙ্গানাতেও শতাধিক কোম্পানি সরে গিয়েছে। এই চিত্র স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিনিয়োগ এবং শিল্পের জন্য অন্যান্য রাজ্যগুলি বাংলার চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় প্রমাণিত হচ্ছে।
শিল্পের অনুপস্থিতি ও তার ভয়াবহ প্রভাব:
প্রকাশ্যে আসা এই রিপোর্ট নির্মম সত্যকে তুলে ধরছে – সত্যিই বাংলায় শিল্পের অভাব প্রকট। ৬৬৬৮টি কোম্পানির এই স্থানান্তর কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি রাজ্যের অর্থনীতিতে এক গভীর ক্ষত। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। শিল্প না থাকায় বেকারত্বের হার লাগামহীনভাবে বাড়ছে, চাকরি পাওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। আর যেটুকু চাকরি মিলছে, তাও টিকিয়ে রাখা বেশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের তরুণ প্রজন্ম হতাশায় ভুগছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও যখন নিজেদের রাজ্যে কাজের সুযোগ মিলছে না, তখন বাধ্য হয়ে তারা ভিনরাজ্য বা বিদেশে পাড়ি জমাতে চাইছে। তাদের কাছে রাজ্যের বাইরেই এখন চাকরি ক্ষেত্রে বিস্তর সুবিধা ও সুযোগের হাতছানি, যা তাদের আকৃষ্ট করছে।
বিরোধীদের দাবি ছিল, তৃণমূল আমলে শিল্পের অগ্রগতি হয়নি। কেন্দ্রের এই তথ্য যেন সেই দাবিরই প্রতিফলন। শিল্পবিহীন এই বাংলা কি এক বেকার প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর না মিললে রাজ্যের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড আরও দুর্বল হয়ে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের জন্ম দিতে পারে।