দেশের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ের আকস্মিক ইস্তফা সোমবার সন্ধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্যজনিত কারণ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করলেও, বিরোধীরা এই যুক্তি মানতে নারাজ। কংগ্রেসের দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি ও রাজ্যসভার চেয়ারপার্সন হিসেবে নির্বাচিত করলেও, তিনি লাগাতার উপেক্ষার শিকার হচ্ছিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও কিরণ রিজিজুর আচরণে তাঁর অসন্তোষই এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কাজ করেছে বলে গুঞ্জন। তবে, এই পদত্যাগের ঘটনা এবার বিহারের আসন্ন নির্বাচনের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছে। জল্পনা তুঙ্গে যে, ধনখড়ের শূন্য আসনে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী এবং সংযুক্ত জনতা দলের (JD-U) প্রধান নীতীশ কুমারকে উপরাষ্ট্রপতি পদে বসানো হতে পারে।
বিজেপির অন্দরেই নীতীশকে নিয়ে গুঞ্জন:
আশ্চর্যের বিষয় হলো, নীতীশকে উপরাষ্ট্রপতি করার দাবি জেডি(ইউ)-এর কোনো নেতা নন, বরং বিজেপির অন্দরেই ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। বিহারে বিজেপির বিধায়ক হরিভূষণ ঠাকুর সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “জগদীপ ধনখড় স্বাস্থ্যগত কারণে ইস্তফা দিয়েছেন। এটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক নয়। তবে, নীতীশ কুমার উপরাষ্ট্রপতি হলে বিহারের মানুষজন নিঃসন্দেহে আনন্দিত হবেন। এটি বিহারের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় হবে।” বিহারের মন্ত্রী ও বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা প্রেমকুমারও এই মতের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকারই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বিহার থেকে কেউ উপরাষ্ট্রপতি হলে আমি খুশি হব।” বিহারের আরেক মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নীরজ কুমার সিংহ বাবলুও এ প্রসঙ্গে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন।
নীতিশের দিল্লির ডাকের নেপথ্যে বিহারের রাজনৈতিক সমীকরণ?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নীতীশ কুমারকে উপরাষ্ট্রপতি পদে বসানোর এই জল্পনার পেছনে একাধিক কার্যকারণ দেখতে পাচ্ছেন। সামনেই বিহারে বিধানসভা নির্বাচন। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপিকে জেতাতে নির্বাচন কমিশন ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিচ্ছে। বিহারে বিজেপি এখনও পর্যন্ত একবারও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হতে পারেনি। তাই গেরুয়া শিবিরের জন্য নীতীশ এবং তাঁর দল জোটসঙ্গী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি নিজেদের আসন সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে আশাবাদী। সেক্ষেত্রে, নীতীশকে মুখ্যমন্ত্রী পদে রাখলে একাধিক নীতিগত বিষয়ে সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তাছাড়া, সত্তরোর্ধ্ব নীতীশের হাতে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব ন্যস্ত করা নিয়ে রাজ্য বিজেপির একাংশের আপত্তি রয়েছে। কিন্তু নীতীশকে চটাতেও নারাজ বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এই পরিস্থিতিতে, তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরানোর একটি কৌশল হিসেবে ধনখড়ের পদত্যাগকেও দেখা হচ্ছে।
রাজ্যসভা পরিচালনা ও নীতীশের কৌশলী রাজনৈতিক চাল:
সোমবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে ধনখড় তাঁর ইস্তফাপত্র পাঠান এবং মঙ্গলবার সকালেই তা গৃহীত হয়। মঙ্গলবার সংসদেও অনুপস্থিত ছিলেন ধনখড়। তাঁর পরিবর্তে রাজ্যসভার চেয়ারের দায়িত্বে দেখা যায় জেডি(ইউ)-এর হরিবংশ নারায়ণ সিংহকে। বাদল অধিবেশন চলাকালীন আপাতত তিনিই রাজ্যসভার অধিবেশন পরিচালনা করবেন। ২০২০ সাল থেকে হরিবংশ রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। বিহারে বিধানসভা নির্বাচন না মেটা পর্যন্ত তিনিই রাজ্যসভা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন বলে জানা গেছে। নীতীশ কুমার একজন অত্যন্ত কৌশলী রাজনীতিক। বিহারে বারবার ক্ষমতাসীন সরকারের সমীকরণ বদলালেও, তিনি মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিজের আসন ধরে রাখতে সফল হয়েছেন। বারবার শিবির বদলের জন্য ‘পল্টুরাম’ তকমা জুটলেও, তিনি নিজের রাজনৈতিক নীতি থেকে একচুলও সরেননি।
নীতিশের সিদ্ধান্তের দোলাচল ও নিশান্তের ভবিষ্যৎ:
তবে, শেষ পর্যন্ত নীতীশ কুমার উপরাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন কিনা, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নীতীশ যদি এই পদ গ্রহণ করেন, সেক্ষেত্রে বিহারের রাজনীতিতে তাঁর ছেলে নিশান্ত কুমারের সমস্ত সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাবে। পরিবারতন্ত্রের দোহাই দিয়ে ইতিমধ্যেই নিশান্তের বিরোধিতা শুরু হয়েছে। নীতীশ বিহার থেকে সরে গেলে, তাঁর ছেলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও টালমাটাল হয়ে যাবে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে, নীতীশ শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, তা বিহার বিধানসভা নির্বাচনের পরই বোঝা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষত, বিজেপির থেকে জেডি(ইউ)-এর আসন সংখ্যা কম হলে, তবেই নীতীশকে উপরাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণে রাজি করানো সহজ হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মত প্রকাশ করছেন – যদি না নীতীশ আবারও শিবির বদল করেন।





