দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে যারা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, সেইসব বিপ্লবীদেরই কিনা সন্ত্রাসবাদী বলা হল! এমন বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রশ্নপত্রে। আর এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ ও সমাজজুড়ে প্রবল ক্ষোভ।
প্রশ্নপত্রে কী লেখা ছিল?
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের পরীক্ষার ১১ নম্বর প্রশ্নে স্পষ্টভাবে লেখা—
“মেদিনীপুরের তিনজন জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম লেখো, যারা সন্ত্রাসবাদীদের দ্বারা নিহত হন?”
এই প্রশ্ন ঘিরেই শোরগোল পড়ে যায়। ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করিয়ে দেন, ব্রিটিশরা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ‘সন্ত্রাসবাদী’ (Terrorist) বলেই আখ্যা দিত, কিন্তু স্বাধীন ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই একই ভাষা ব্যবহারের মানে কী?
বিপ্লবীদের উত্তরাধিকারীদের প্রতিক্রিয়া
ঘটনায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ মেদিনীপুরের বিপ্লবী পরিবারের সদস্যরা। স্বাধীনতা সংগ্রামী বিমল দাশগুপ্তের পুত্র রণজিৎ দাশগুপ্ত বলেন, “যাদের নাম ইতিহাসের পাতায় সম্মানের সঙ্গে লেখা, তাদের সন্ত্রাসবাদী বলা চরম লজ্জার।”
শিক্ষানুরাগী সংগ্রামী মঞ্চের সম্পাদক কিংকর অধিকারী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ইতিহাস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবিলম্বে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও তদন্ত নির্দেশ
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জয়ন্তকিশোর নন্দী জানান, বিষয়টি উপাচার্যের নজরে আনা মাত্রই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “সম্ভবত ইংরেজি থেকে অনুবাদের সময় এই ভুল হয়েছে।” আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিজেপির ক্ষোভ ও অভিযোগ
এই ঘটনা নিয়ে ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী এবং শিক্ষামন্ত্রীর কাছে ইমেল মারফত অভিযোগ জানিয়েছেন জেলা বিজেপির সহ-সভাপতি ডঃ শঙ্কর গুচ্ছাইত। বিজেপি নেতা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বলেন,
“এই বাংলার মেদিনীপুর হল বিপ্লবীদের পবিত্র ভূমি। ক্ষুদিরাম, বীরেন শাসমল, মাতঙ্গিনী হাজরা, সুশীল ধারা, সতীশ সামন্তের মতো বিপ্লবীদের জন্মস্থান। সেই জেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদেরই সন্ত্রাসবাদী বলা হল! এটাও কি ভুল? নাকি এটাই ‘এগিয়ে বাংলার’ নমুনা?”
রাজনীতি বনাম ইতিহাসের সত্য?
প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষার মঞ্চে এমন সংবেদনশীল বিষয়ে এত বড় ভুল কীভাবে হতে পারে? নাকি এই ভুলই আমাদের ঐতিহাসিক মূল্যবোধ ও জাতীয় চরিত্রের প্রতি অজ্ঞতা ও অবহেলার পরিচয়?
ইতিমধ্যেই শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্টজনেরা একে নক্কারজনক বলে অভিহিত করেছেন এবং অবিলম্বে দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
উপসংহার
স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও যদি বিপ্লবীদের সন্ত্রাসবাদী বলে প্রশ্নপত্রে উল্লেখ হয়, তাহলে তা শুধুই একাডেমিক ভুল নয়, বরং তা হয়ে দাঁড়ায় ইতিহাসকে অপমান করার সামিল। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হল, শিক্ষার আসরে দায়িত্বজ্ঞান কতটা জরুরি এবং ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা কতটা প্রাসঙ্গিক।





