একসময় দক্ষিণের রাজ্যগুলির মাছের উপর নির্ভরশীল পশ্চিমবঙ্গ এখন মৎস্য উৎপাদনে অনেকটাই স্বাবলম্বী। শুধু তাই নয়, রাজ্যের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিবেশী রাজ্যগুলিতেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মাছের রফতানি। সম্প্রতি বণিকসভা মার্চেন্ট চেম্বার অফ কমার্সের উদ্যোগে আয়োজিত মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ বিষয়ক আলোচনাসভায় এই সুখবর দিলেন রাজ্যের মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী। তিনি দাবি করেছেন, বিহার, ওড়িশা এবং ঝাড়খণ্ড এখন পশ্চিমবঙ্গের মাছের বড় ক্রেতা।
মৎস্যমন্ত্রী জানান, পশ্চিমবঙ্গে মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলস্বরূপ বাইরে থেকে মাছ আমদানি অনেক কমে গেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আগামী এক-দেড় বছরের মধ্যে রাজ্যকে সম্পূর্ণ আমদানি-মুক্ত করা সম্ভব হবে। মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এক লক্ষ ৬২ হাজার টন মাছ বিভিন্ন রাজ্যে রফতানি হয়েছিল, যা ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বেড়ে এক লক্ষ ৭৮ হাজার টনে পৌঁছেছে। চিংড়ি ছাড়াও মিষ্টি জলের সব ধরনের মাছই এখন এই সমস্ত রাজ্যগুলিতে রফতানি করা হচ্ছে। ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড ছাড়াও কিছু মাছ মহারাষ্ট্রেও রফতানি হচ্ছে বলে জানা গেছে।
উৎপাদনে দ্বিতীয় স্থানে পশ্চিমবঙ্গ:
মৎস্য দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন, গত ১২-১৩ বছরে পশ্চিমবঙ্গে মাছের উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২২-২৩ আর্থিক বছরে রাজ্যে প্রায় ২০.৪৫ লক্ষ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। মাছ উৎপাদনের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে অন্ধ্রপ্রদেশের পরেই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে, এবং এর পরেই রয়েছে কর্ণাটক। একসময় অন্ধ্রপ্রদেশের রুই, কাতলার উপর পশ্চিমবঙ্গের যে প্রবল নির্ভরতা ছিল, ধাপে ধাপে মাছের চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় সেই নির্ভরতা এখন অনেকটাই কমে এসেছে।
বিপন্ন দেশি মাছের পুনরুত্থান ও বৃহৎ জলাশয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি:
মৎস্যমন্ত্রী বিপ্লব রায়চৌধুরী এদিন এক উদ্বেগজনক তথ্যও প্রকাশ করেন। তিনি জানান, রাজ্য থেকে প্রায় ৩৩ রকমের দেশি মাছ এখন বিপন্ন। প্রাকৃতিক নানা কারণে এই সমস্ত মাছের আকাল দেখা দিয়েছে এবং বাঙালির পাতে তাদের এখন চট করে দেখা যায় না। এই সমস্যা মোকাবিলায় রাজ্য সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। রাজ্যে পুঁটি, ট্যাংরা, মৌরলা, শিঙি, মাগুর-এর মতো বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের চাষ শুরু হবে। পাশাপাশি, বড় জলাশয়ে বড় আকারের রুই, কাতলা উৎপাদনের জন্য বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ২২৮ হেক্টর বড় জলাশয়ে এই ধরনের মাছের চাষ শুরু হয়েছে, যেখানে দেড় কেজি থেকে দুই কেজির রুই, কাতলা উৎপাদন হবে।
প্রাণীসম্পদেও বিনিয়োগের আহ্বান:
অন্য দিকে, রাজ্যের প্রাণীসম্পদ মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ শিল্প সংস্থাগুলিকে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট’ পালনের জন্য খামার ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ প্রকল্পের জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মাংস অত্যন্ত সুস্বাদু এবং এর চামড়ারও বাজারে বেশ দাম ও কদর রয়েছে।’ পুরুলিয়া জেলা এই ধরনের ছাগল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত অঞ্চল বলেও তিনি জানান। দফতরের সচিব অভিজিৎ শেভালে জানান, এই ধরনের ছাগলের মাংস দেশ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনের কথা ভাবা হচ্ছে, যার জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। এর মধ্যেই পুরুলিয়া জেলাতে ‘ব্ল্যাক বেঙ্গল গোট’ চাষের জন্য বেশ কিছু ‘ফামার্স প্রডিউসার্স কোম্পানি’ তৈরি করা হয়েছে।
রাজ্যের এই মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ উন্নয়ন উদ্যোগগুলি একদিকে যেমন গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।