দক্ষিণ কলকাতার আইন কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা তদন্তে নতুন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। লালবাজারের গোয়েন্দারা এখন এই সম্ভাবনার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন যে, ঘটনার মূল অভিযুক্ত মনোজিৎ মিশ্র ওরফে ম্যাঙ্গো ধর্ষণের পর দক্ষিণ কলকাতার দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ফোন করে ‘প্রোটেকশন’ চেয়েছিল। মনোজিতের ফোনের সিডিআর (কল ডিটেলস রেকর্ড) খতিয়ে দেখতে গিয়েই এই তথ্য হাতে এসেছে তদন্তকারীদের। প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে মনোজিতের কথোপকথনের বিষয়বস্তু জানতে দফায় দফায় জেরা করা হচ্ছে তাকে।
আইনি পরামর্শ ও কলেজ কর্তৃপক্ষের যোগসূত্র:
তদন্তে আরও জানা গেছে, নির্যাতিতা যখন পুলিশের দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেই খবর পেয়েই মনোজিৎ দ্রুত একজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি পরামর্শ নিতে চেয়েছিল। এমনকি, ঘটনার পরই অভিযুক্তের সঙ্গে কলেজের ভাইস প্রিন্সিপালের যোগাযোগের তথ্যও গোয়েন্দাদের হাতে এসেছে বলে সূত্র মারফত খবর। এই পর্যন্ত গণধর্ষণের ঘটনায় মোট ১৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং প্রত্যেকের বয়ান খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুক্রবার লালবাজারে এক পুলিশ কর্তা অবশ্য সিডিআর-এর তথ্য নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে অস্বীকার করে এটিকে তদন্তের বিষয় বলে উল্লেখ করেন।
বালিগঞ্জে কেন? গভীর রহস্যের ইঙ্গিত:
গণধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে গত ২৫ জুন রাতে। ঘটনার পর মনোজিৎ এবং তার সঙ্গীরা বালিগঞ্জে পালিয়ে যায়। ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে গোয়েন্দারা এই তথ্য পেয়েছেন। অভিযুক্তরা বালিগঞ্জে কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পুলিশ সূত্রে খবর, দুই সঙ্গীকে নিয়ে মনোজিৎ কলেজ থেকে বেরিয়ে রাতের খাবার খেয়ে বালিগঞ্জে গিয়েছিল। তদন্তকারীরা এখন খতিয়ে দেখছেন, মনোজিৎ যাদের ফোন করেছিল, তাদের সঙ্গেই কি দেখা করতে গিয়েছিল, নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনও গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে?
এছাড়াও, তদন্তে উঠে এসেছে যে, মনোজিৎ ইউনিয়ন রুম ছাড়াও গার্ডরুমে নিয়মিত মদের আসর বসাতো। কিন্তু ঘটনার রাতে সে এই গার্ডরুমটিকেই ব্যবহার করেছিল। এর পিছনে কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কিনা, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
“দাদা ভিতরে সই করছে”: গার্ডের বয়ানে চাঞ্চল্য
শুক্রবার ভোরে মনোজিৎ এবং ঘটনার সময়ে উপস্থিত গার্ড পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তদন্তকারীরা ল’কলেজের ঘটনাস্থলে পৌঁছন। সেখানে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করা হয় এবং থ্রি-ডি স্ক্যানার ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা গেছে, ঘটনার রাতে নিরাপত্তারক্ষী পিনাকীর কাছে মনোজিৎ জানতে চায়, “গার্ডরুম খালি আছে? ভিতরে জল পাওয়া যাবে?” পিনাকী পাল্টা প্রশ্ন করলে মনোজিৎ তার হাতে টাকা গুঁজে দিয়ে বলে, “ভিতরে কী করব, তা জানার দরকার নেই।” অভিযোগ, বেশি প্রশ্ন করায় গার্ডকে দেখে নেওয়ার হুমকিও দেয় সে। জেরায় পুলিশকে পিনাকী জানিয়েছে, এরপর সে বাইরে চা খেতে চলে যায়। ফিরে এসে দেখতে পায়, ধৃত জ়ইব ও প্রমিত দু’জনে বাইরে গার্ড দিচ্ছে। পিনাকীকে জানানো হয়, কয়েকটি কাগজে সই বাকি আছে। “দাদা ভিতরে কাজ করছে। কাজ শেষ হলেই তাকে ডেকে নেওয়া হবে।” এরপর রাতে পিনাকীকে ডেকে ঘরের চাবি ফেরত দেওয়া হয়।
“হুইসল ব্লোয়ার” কেন নয়? আদালতে তীব্র সওয়াল-জওয়াব
গণধর্ষণের ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী নিরাপত্তারক্ষী পিনাকী বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুক্রবার আলিপুর আদালতে পেশ করা হয়। এ দিন আদালতে অভিযুক্তের আইনজীবী দিব্যেন্দু ভট্টাচার্য সওয়াল করেন, “এই ঘটনা গার্ডরুমে হওয়ায় যদি নিরাপত্তারক্ষীকে গ্রেফতার করা হয়, তাহলে কলেজের প্রিন্সিপাল অথবা ভাইস প্রিন্সিপাল, কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কেন গ্রেফতার করা হবে না? যে সব ধারা দেওয়া হয়েছে, তা রক্ষীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যদি কলেজে প্রিন্সিপাল রাত পর্যন্ত কাজ করেন, তাহলে কি তাঁকেও বেরিয়ে যেতে বলতে পারেন একজন নিরাপত্তারক্ষী?” দিব্যেন্দু আরও বলেন, “নিরাপত্তারক্ষীর কাজ হলো, বহিরাগতদের ঢুকতে না দেওয়া। তাকে কলেজের অন্যদের মতো সাক্ষী হিসেবে রাখতে পারতো পুলিশ। সামান্য ১২ হাজার টাকা বেতন পায় সে। আগে কোনও অপরাধ করেনি। নিরাপত্তারক্ষীকে সব সময় নির্দেশ মেনে চলতে হয়। সে পরিস্থিতির শিকার।”
পাল্টা সওয়ালে সরকারি আইনজীবী সৌরিন ঘোষাল বলেন, “নির্যাতিতাকে সুরক্ষা না দিয়ে অভিযুক্তের কুকর্ম সে সুরক্ষিত করেছে। রক্ষী যদি আটকাতো, তাহলে এই ঘটনা ঘটতো না। ওর কাজ ছিল হুইসল ব্লোয়ারের। কিন্তু, তা সে করেনি। সব দেখে বুঝে কাউকে কিছু জানায়নি।”
অন্যদিকে, এদিন আলিপুর আদালতে এক আইনজীবী কলেজের খাতা-সহ বাজেয়াপ্ত নথি ফেরতের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু, সরকারি আইনজীবী স্পষ্ট বলেন, “এটি রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলা। ফলে, আলাদা দিনে আদালতের কাছে আবেদন করতে হবে।” বিচারকও তাতে সম্মতি দেন। এই ঘটনায় সব পক্ষের শুনানি শেষে আদালত ৮ জুলাই পর্যন্ত অভিযুক্তের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়।
তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই কসবা গণধর্ষণ কাণ্ডের পরতে পরতে নতুন তথ্য ও জটিলতা সামনে আসছে, যা সমাজের গভীরে প্রভাবশালীদের যোগসাজশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।