বাংলাদেশি ছাত্র থেকে ‘অতিথি শিক্ষক’, জালিয়াতির ছায়া? উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে শোরগোল

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক নাটকীয় রহস্য উপন্যাসের কেন্দ্রে। কাঁটাতার পেরিয়ে আসা এক বাংলাদেশি যুবক, শান্ত ভৌমিক ওরফে ‘শান’, ছাত্র পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে রীতিমতো ‘অতিথি শিক্ষক’-এর আসনে বসেছেন, যা নিয়ে তোলপাড় রাজ্য। শুধু তাই নয়, ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে এ দেশে বাইক ও বাড়ি কেনার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এই ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার উপর বড়সড় প্রশ্ন চিহ্ন ফেলে দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, শান্ত ভৌমিক একজন বাংলাদেশি নাগরিক, যিনি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ (Mass Communication) বিভাগের ছাত্র হিসেবে এসেছিলেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, সেই ছাত্রই পরবর্তীতে একই বিভাগের ‘গেস্ট ফ্যাকাল্টি’ (অতিথি শিক্ষক) হিসেবে নিযুক্ত হন! কীভাবে একজন বিদেশি ছাত্র, যিনি সম্ভবত স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছিলেন, কোনো রকম নিয়োগের যোগ্যতা যাচাই ছাড়াই শিক্ষক পদে আসীন হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরেই। গণযোগাযোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান বরুণ রায়, আজতক বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শান্তকে তাঁদের প্রাক্তন ছাত্র এবং পরে ‘মেন্টর’ হিসেবে উল্লেখ করলেও, তাঁর বর্তমান অবস্থান বা পলাতক হওয়ার বিষয়ে মন্তব্য করতে পারেননি।

এই ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিক হলো শানের এ দেশে সম্পত্তি অর্জন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি ‘শান’ নামে শিলিগুড়িতে একটি বাইক কিনেছেন এবং এমনকি নিজের নামে বাড়িও কিনেছেন! শান্তর পাসপোর্ট ও ভিসায় তাঁর নাম ‘শান্ত ভৌমিক’ থাকলেও, বাইকের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে ‘শান’ নামে। শিলিগুড়ি আঞ্চলিক পরিবহন দফতরে স্থানীয় ঠিকানা ব্যবহার করে বাইকটি রেজিস্টার করা হয়েছে এবং সেটি ঋণে কেনা। প্রশ্ন উঠছে, ভোটার আইডি, আধার কার্ড বা প্যান কার্ড ছাড়া কীভাবে এই রেজিস্ট্রেশন সম্ভব হলো? তাহলে কি শান্ত এ দেশে ভুয়ো পরিচয়পত্র তৈরি করেছেন? যদি করে থাকেন, তবে এর নেপথ্যে কারা রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে প্রশাসন।

ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসেছে। গত শুক্রবারই বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়েন্ট রেজিস্ট্রার স্বপনকুমার রক্ষিত শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিয়ে শান্ত ভৌমিকের বিষয়ে তদন্তের আর্জি জানিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন মহেন্দ্রনাথ রায়ও জয়েন্ট রেজিস্ট্রারকে তদন্তের জন্য চিঠি পাঠিয়েছেন এবং গণযোগাযোগ বিভাগের প্রধান বরুণ রায়ের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। কীভাবে একজন বিদেশি নাগরিক ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করে শিক্ষকতা করলেন, তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।

এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর থেকেই শান্ত ভৌমিক গা ঢাকা দিয়েছেন বলে উত্তরবঙ্গের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো খবর দিচ্ছে। তাঁর ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এই ঘটনা উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও নজরদারির অভাব নিয়ে গুরুতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই রহস্যের জট কীভাবে ছাড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy