ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া তাদের লাখ লাখ সেনা হারিয়েছে, এবং ধারণা করা হচ্ছে যে জুন মাস শেষ হওয়ার আগেই রাশিয়ার সামরিক হতাহতের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে। এই বিপুল পরিসংখ্যানের মধ্যে যুদ্ধকালে আহত ও নিহত উভয়ই রয়েছে। এই রক্তক্ষয়ী ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, ইউক্রেনের ভূখণ্ডে অবৈধ দখল বজায় রাখা ও সম্প্রসারণের জন্য মস্কো যেকোনো মূল্য চুকাতে প্রস্তুত – এমনকি তা যদি হয় নিজেদের মানুষের জীবনের বিনিময়ে।
‘মাংস কুচানো যন্ত্রের’ নিষ্ঠুরতা: ইউক্রেনে রুশ রণনীতির রক্তাক্ত মূল্য
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বিপুল ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ হলো দেশটির কুখ্যাত ‘মাংস কুচানো যন্ত্রের’ (meat grinder) যুদ্ধকৌশল। এই কৌশলে কাতারের পর কাতার সৈন্যকে শত্রুপক্ষের গোলার মুখে পাঠানো হয়, যাতে অনেক সৈন্য প্রাণ হারালেও অন্তত কয়েকজন শত্রুব্যূহ ভেঙে এগিয়ে যেতে পারেন।
ভ্লাদিমির পুতিনের এই কৌশল রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জনে সহায়তা করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা বেদনাদায়ক ও অত্যন্ত ধীরগতির অগ্রগতি। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বর্গকিলোমিটার ভূখণ্ড দখলের জন্য রাশিয়ার গড়ে ৫৩ জন সেনা হতাহত হয়েছেন। এই সংখ্যা যুদ্ধের নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
রণকৌশলে বদল, তবু জনবল সংকট: পুতিনের ‘সৃজনশীল’ সমাধান
ব্যাপক হারে সেনা হারানোর কারণে রাশিয়া এখন ইউক্রেনে তাদের যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তন এনেছে। এখন রুশ বাহিনী ছোট ছোট সেনা ইউনিট ব্যবহার করছে। এর প্রধান কারণ হলো, যুদ্ধে অনেক জুনিয়র কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। যদিও সৈন্যদের মধ্য থেকে নতুন অফিসার নিয়োগ দিয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্রুত শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে, কিন্তু নতুন কর্মকর্তাদের বড় আকারের সেনাদল পরিচালনার মতো যথেষ্ট প্রশিক্ষণ বা অভিজ্ঞতা নেই।
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে নতুন সেনা নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও চাপ বেড়েছে। পুতিন নতুন করে সেনা নিয়োগের ব্যাপারে অনাগ্রহী হওয়ায়, জনবলসংকট মেটাতে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে নানা ‘সৃজনশীল’ কিন্তু বিতর্কিত উপায় বের করতে হচ্ছে।
আহত সেনাদের সম্মুখ সমরে ঠেলে দেওয়া: সিএনএন জানিয়েছে, আহত সেনাদের পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। রুশ সেনারা অভিযোগ করেছেন, চিকিৎসা শেষ হওয়ার আগেই তাদের জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন অপারেটররা এমন ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে—ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছেন—এমন রুশ সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থান করছেন।
কারাগার থেকে সৈনিক সংগ্রহ: সামাজিক ঝুঁকি: জনবলসংকট মেটাতে রাশিয়ার সামরিক নিয়োগকর্তারা কারাগারগুলোতে যাচ্ছেন। সাধারণ ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বন্দীদের যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। ইউক্রেনের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা জানাচ্ছে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই পদ্ধতিতে আনুমানিক ১ লাখ ৮০ হাজার সৈন্য নিয়োগ করেছে। ২০২২ সালের গ্রীষ্মকালে এই পদ্ধতির সূচনা করেছিল ভাগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোশিন। এভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সাবেক বন্দীদের মধ্যে কিছু নারীও রয়েছেন, তবে তাদের সংখ্যা গোপন রাখা হয়েছে। এটি ক্রেমলিনের প্রচারিত ‘পুরুষত্বের’ বার্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মিত্র দেশের উপর বাড়তি নির্ভরতা: রাশিয়াকে এখন ক্রমেই সেনাবাহিনীর জনবলসংকট মেটাতে মিত্রদেশ উত্তর কোরিয়া ও চীনের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন, অন্তত ১৫৫ জন চীনা সেনা রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেনে লড়াই করছেন। উত্তর কোরিয়া যেসব সেনা রাশিয়ায় পাঠিয়েছে, তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজারজন হতাহত হয়েছেন।
বেসামরিকদের জন্য লোভনীয় প্রস্তাব: অর্থের বিনিময়ে প্রাণ: সেনাসংকট মোকাবিলায় রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো বেসামরিক নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় বেতন ও সুবিধা দেওয়া। প্রতি মাসে এভাবে নিয়োগপ্রাপ্তদের মাসে কমপক্ষে ২ লাখ রুবল (২ হাজারের বেশি মার্কিন ডলার) বেতন দেওয়া হয়। যুদ্ধরত সেনারা এখন রাশিয়ার শীর্ষ আয়কারী ১০ শতাংশের মধ্যে স্থান পেয়েছেন। উচ্চ বেতনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী বা ‘চুক্তিভিত্তিক’ নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা পরিবারগুলোকে নানা সুযোগ–সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। নিম্ন সুদে গৃহনির্মাণ ঋণ দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধে যাঁরা নিহত হচ্ছেন কিংবা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হচ্ছেন, তাঁদের উদার হস্তে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। কিছু অঞ্চলে, সমাজকল্যাণ বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি অংশই বরাদ্দ করা হচ্ছে সেনা ও তাঁদের পরিবারদের জন্য। অর্থের এই প্রবাহ অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা রাশিয়ার কিছু অঞ্চলের মানুষের জীবন বদলে দিয়েছে। এই আর্থিক উন্নতি ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ প্রতি জনসমর্থন আরও জোরালো করেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক মূল্য: বদলে যাচ্ছে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ
তবে, কোনো অঞ্চল থেকে এতসংখ্যক পুরুষের অন্যখানে চলে যাওয়া (তাঁদের অনেকেই কোনো দিন আর ফিরে আসবে না) অনেক ছোট সম্প্রদায়ের জনমিতিক বিন্যাসের পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে। এসব জনগোষ্ঠীর বড় অংশই এখন নারী, ছোট শিশু ও বয়স্করা।
যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব সৈনিক শারীরিক বা মানসিকভাবে স্থায়ী ক্ষত নিয়ে গ্রামে বা ছোট শহরে ফিরে আসছেন, তাঁরা প্রতিবন্ধী ভাতা পাবেন। কিন্তু রাশিয়ার বেহাল স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসহায়তা পেতে তাঁদের সংগ্রাম করতে হতে পারে।
এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি সংকট হলো রাশিয়ার জনসংখ্যা হ্রাস পাবে। যদিও রাশিয়ার সরকার এখন নারীদের বেশি বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করছে এবং ‘মাদার হিরোইন’ পুরস্কার পুনঃপ্রবর্তন করেছে, কিন্তু ‘দশ বা তার বেশি সন্তান’ জন্ম দিয়ে সম্মান অর্জন করতে চাওয়া নারীরা পুরুষ সঙ্গী খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
অন্যদিকে, সাবেক বন্দীদের মধ্যে যাঁরা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বেঁচে ফিরেছেন, তাঁরা সমাজের জন্য নতুন এক ঝুঁকি তৈরি করছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সাবেক কারাবন্দী সৈনিকেরা এ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। এসব হত্যাকাণ্ড নিহত সেনাদের পরিবারের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
উপসংহার: রাশিয়ার মানবসম্পদ কি সত্যিই অসীম?
যদিও রাশিয়ার জনসংখ্যা অনেক বড়, তাদের মানবসম্পদ অসীম নয়। ২০২২ সালে ইউক্রেন আগ্রাসন শুরুর আগ থেকেই মানবসম্পদের দিক থেকে চাপে রয়েছে রাশিয়া। এই আগ্রাসনের কারণে দেশটির মানবসম্পদ ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং আরও বেশি সংখ্যক সেনার প্রয়োজনীয়তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। রাশিয়া এমনিতেই একটি জনমিতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সমাজে সন্তান ধারণে সক্ষম জনগণের অনুপাত কম। এই যুদ্ধ সেই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে, যা রাশিয়ার ভবিষ্যতের জন্য এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করেছে। এই ‘বিশেষ সামরিক অভিযানের’ চূড়ান্ত মূল্য কি শুধু ভূখণ্ড দখল, নাকি রাশিয়ার নিজস্ব সামাজিক ও জনমিতিক কাঠামোতেও এক অপরিবর্তনীয় ক্ষত তৈরি হচ্ছে?