এক মুহূর্ত আগেও যেখানে আধখাওয়া রুটি আর ডালের বাটি নিয়ে ডাক্তারী ছাত্রদের কলরবে মুখরিত ছিল বিজে মেডিক্যাল কলেজের ডাইনিং রুম, সেখানে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ আর পোড়া গন্ধ। লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারের ভয়াবহ আছড়ে পড়ায় মুহূর্তের মধ্যে গোটা হস্টেলই পরিণত হয়েছে এক নিঝুম, ঝলসে যাওয়া ধ্বংসস্তূপের প্রতীকে। যে স্বপ্নগুলো ডানা মেলতে শুরু করেছিল, নিমেষেই তা ধূলিসাৎ।
টেক-অফের ৫ মিনিটে বিপর্যয়: তছনছ ছাত্রজীবন
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে টেক অফ করার ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যেই এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট এআই-১৭১ সশব্দে ধাক্কা মারে কলেজ ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা হস্টেলের একটি ব্লকে। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত পাঁচ জন মেডিক্যাল ছাত্র। আহত হয়েছেন চল্লিশেরও বেশি, এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে চাপা পড়ে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যে উইংটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে, সেখানে মূলত আন্ডারগ্র্যাজুয়েট দ্বিতীয় বর্ষ এবং পিজি স্তরের ছাত্ররা থাকতেন। দুর্ঘটনার সময়ে হস্টেলের ভিতরে ১৫০ জনের বেশি ছাত্র ছিলেন বলে জানা গেছে। দুপুরের খাবারের সময় হওয়ায় অধিকাংশ ছাত্রই তখন নিজের ঘরে বা ওই ‘অভিশপ্ত’ ডাইনিং স্পেসে ছিলেন, যখন নিয়তির নির্মম পরিহাস তাদের উপর আঘাত হানল।
সিসিটিভি-তে বিভীষিকা, প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দি
সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে ধরা পড়েছে, হঠাৎ করেই একটি বিশাল আকারের বিমান হস্টেলের দিকে ধেয়ে আসে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিল্ডিংয়ে ধাক্কা মারে। বিকট শব্দের সঙ্গে সঙ্গে একটি তলা ধসে পড়ে এবং বেশ কিছু ঘর পুরোপুরি গুঁড়িয়ে যায়। বহু ছাত্র ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যান।
বিমানের ধাক্কায় হস্টেলের দক্ষিণ-পূর্ব অংশ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, কমপক্ষে ১৬টি ঘর একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। দুর্ঘটনার তীব্রতায় আশপাশের বাড়ির জানলা, দরজা, বিদ্যুৎ সংযোগ ভেঙে পড়ে। বিস্ফোরণ এতটাই তীব্র ছিল যে, কয়েকশো মিটার দূরে হাসপাতালের ওয়ার্ডেও কম্পন অনুভূত হয়।
তৃতীয় বর্ষের ছাত্র তুষার চৌহান সেই ভয়ংকর মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমি আমার ঘরে বসে ল্যাপটপে লেকচার নোট পড়ছিলাম। হঠাৎ একটা গর্জনের মতো আওয়াজ শুনি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ছাদটা যেন আমার মাথার উপরে ধসে পড়ে। আমি কোনোক্রমে জানলার ফ্রেম ধরে বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়ি।”
আর এক পিজি ছাত্র রমেশ শাহ বলেন, “যত দূর দেখেছি, কয়েকটা ঘরে তখন ৩-৪ জন ছাত্র একসঙ্গে ছিলেন। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশে আগুন, ধোঁয়া আর কোলাহলে ভরে যায়। মনে হচ্ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো এলাকা।” ছাত্রদের একাংশ ভয়ে জানলা ও ছাদ ভেঙে বাইরে লাফিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তাতেও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
উদ্ধারকার্য ও মানসিক ক্ষত
দুর্ঘটনার পর পরই উদ্ধারকার্যে নামে এনডিআরএফ, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক ইউনিট। প্রায় ১৫টি অ্যাম্বুল্যান্স আহতদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। উদ্ধারকারী দলের এক আধিকারিক জানান, ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ বেঁচে আছেন কি না সেটা বোঝার জন্য থার্মাল সেন্সর ও শব্দ শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
হস্টেলের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এখন সম্পূর্ণ সিল করে রাখা হয়েছে। সেখানে এখনও বিমানের ধাতব অংশ, ইঞ্জিনের ধ্বংসাবশেষ এবং ছাত্রদের পোড়া বই, জামাকাপড় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ওই অংশ আর ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বেঁচে যাওয়া ছাত্রদের জন্য কলেজ গেস্ট হাউস, আশেপাশের হস্টেল ও কিছু হোটেলে সাময়িকভাবে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এই ঘটনার ফলে ছাত্রদের মধ্যে প্রবল মানসিক আঘাত সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এখনও ভয় ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইতিমধ্যেই ছাত্রদের কাউন্সেলিং শুরু করেছেন। কলেজের ডিন বলেন, “যে পড়ুয়াদের মৃত্যু হয়েছে, তাঁরা ভবিষ্যতের ডাক্তার। ওরা তো আমাদের ছাত্র। পরিবারের কাউকে হারানোর যন্ত্রণার সমান।”
হস্টেলের ছাত্রদের অভিযোগ, এত বড় মেডিক্যাল কলেজ ক্যাম্পাসের উপর দিয়ে বিমান ওঠানামা নিয়ে আগে কোনো সতর্কতার কথা ভাবা হয়নি। তাঁরা চাইছেন, ভবিষ্যতে হস্টেল বা হাসপাতালের উপর দিয়ে কোনো বিমান চলাচল যাতে না হয়, তার নিশ্চয়তা দেওয়া হোক। কলেজের অধ্যাপক-চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এই দুর্ঘটনা শুধু পাঁচটি তরতাজা প্রাণই কেড়ে নেয়নি, তা ছাত্রদের আত্মবিশ্বাস, ভবিষ্যৎ স্বপ্ন এবং ক্যাম্পাস জীবনের নিরাপত্তাকে চুরমার করে দিয়েছে।
কলেজ ও প্রশাসনের মূল চ্যালেঞ্জ এখন একটাই— এই শোকের ছায়া থেকে ছাত্রদের যত দ্রুত সম্ভব বের করে তাঁদের আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা। তবে সেই যাত্রা সহজ হবে না, কারণ বিজে মেডিক্যাল কলেজের হস্টেল এখন শুধু ইট, সিমেন্ট আর ধ্বংসাবশেষ নয় — পরিণত হয়েছে ভয়, ক্ষতি আর অপূরণীয় শূন্যতার প্রতীকে।