“দুর্ঘটনায় গিয়ে ছিল ১৩৩টি প্রাণ”-৩৭ বছরের ব্যবধানে দুই ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনা আহমেদাবাদে

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। নামটা শুনলে হয়তো অনেকেই এর ব্যস্ততা আর আধুনিকতার কথা ভাবেন। কিন্তু এই বিমানবন্দরই যেন এক নীরব সাক্ষী, ৩৭ বছরের ব্যবধানে দেশের দুটি ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনার। ১৯৮৮ সালের ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১৩-এর মর্মান্তিক অবতরণ এবং ২০২৫ সালের এয়ার ইন্ডিয়া ১৭১-এর উড়ানের পর পরই ভেঙে পড়া – উভয় ঘটনাই আহমেদাবাদের আকাশকে কালো মেঘে ঢেকে দিয়েছে।

১৯৮৮ সালের বিভীষিকা: যখন কুয়াশা আর ভুলের মাশুল গুণতে হলো ১৩৩টি প্রাণ
তারিখটা ছিল ১৯শে অক্টোবর, ১৯৮৮। মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছিল ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ১১৩। ক্যাপ্টেন ও.এম. দাল্লায়া এবং ফার্স্ট অফিসার দীপক নাগপালের নেতৃত্বে বিমানটি নির্ধারিত সময়ের ২০ মিনিট পর, সন্ধ্যা ৫.৪৫ মিনিটে মুম্বাই থেকে উড়ান ভরে।

কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হয় আহমেদাবাদে অবতরণের ঠিক আগে। ভোরবেলার কুয়াশা আর বাতাসের উপরের স্তরে কিছু চিমনির ধোঁয়ার কারণে রানওয়ের দৃশ্যমানতা ছিল অত্যন্ত কম। আহমেদাবাদ কন্ট্রোল রুম থেকে ৬.২০ মিনিটে পাইলটদের জানানো হয় এই প্রতিকূল আবহাওয়ার কথা। তাদের ১৭০০ ফুট উচ্চতায় যোগাযোগ করার নির্দেশও দেওয়া হয়।

দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় পাইলটদের একটি মারাত্মক ভুল। রানওয়ে খোঁজার প্রচেষ্টায় তারা এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, মাটি থেকে বিমানের উচ্চতা কমে আসছিল দ্রুতগতিতে, যা তাদের খেয়াল ছিল না। কন্ট্রোল রুম থেকে অবতরণের কোনো ছাড়পত্র না পাওয়া সত্ত্বেও, সন্ধ্যা ৬.৫৩ মিনিটে বিমানটি রানওয়ে থেকে মাত্র ২.৫৪ কিলোমিটার দূরে একটি গাছে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে। ১২৯ জন যাত্রী এবং ৬ জন ক্রু মেম্বার সহ মোট ১৩৫ জনের মধ্যে ১৩৩ জনই প্রাণ হারান, যা ভারতের বিমান চলাচলের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় তৈরি করে।

২০২৫ সালের ট্র্যাজেডি: উড়ানের পর পরই ‘মে-ডে কল’ আর তারপর নীরবতা
আজ, ১২ই জুন, ২০২৫। আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল এয়ার ইন্ডিয়া AI 717 বিমান। কিন্তু নিয়তি যেন ১৯৮৮ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চেয়েছিল। টেকঅফের কিছুক্ষণ পরেই পাইলটরা একটি ‘মে-ডে কল’ পাঠান, যা চরম বিপদের ইঙ্গিত। পাল্টা এটিসি থেকে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও, কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি।

এরপরই আসে সেই ভয়াবহ খবর। বিমানটি বিমানবন্দরের পাঁচিলের কিছুটা দূরে একটি মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের উপর হঠাৎই ভেঙে পড়ে। বিমানের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে, দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। এই দুর্ঘটনায় বিমানের প্রায় সকল যাত্রীরই প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা আহমেদাবাদের উপর ফের এক শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: সতর্কতা ও প্রশ্ন
৩৭ বছরের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া এই দুটি ঘটনা আহমেদাবাদ বিমানবন্দর এবং দেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তার মান উন্নত হওয়া সত্ত্বেও, কেন একই বিমানবন্দরে এমন দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ব্ল্যাক বক্স এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারের বিশ্লেষণ থেকে প্রতিটি ঘটনার পেছনের কারণ উদঘাটন করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক পুনরাবৃত্তি এড়ানো যায় এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। এই দুটি ঘটনাই স্মরণ করিয়ে দেয়, আকাশপথে যাত্রা যতই নিরাপদ মনে হোক না কেন, বিপদ সব সময় lurking করে, আর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলে না।

Related Posts

© 2026 Tips24 - WordPress Theme by WPEnjoy